


সোমনাথ বসু, কলকাতা: ছেলেটা পাগল, লোকে বলত। তবে মানসিকভাবে নয়। এ ছেলে ইস্ট বেঙ্গল পাগল। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় ওর ঠিকানা ছিল ক্লাব তাঁবু। অপরিচ্ছন্ন জামা-প্যান্ট, মাথায় টুপি আর মুখে অকৃত্রিম হাসি। অনেকে লেগ পুল করলেও বিরক্তির লেশমাত্র নেই। বাইচুং ভুটিয়াকে দেখলেই জড়িয়ে ধরত। ইস্ট বেঙ্গল জিতলে আনন্দে উদ্বেল। আর উলটোটা হলে কেঁদে ভাসাতেও দেখেছি বেজিকে। হ্যাঁ, বেজি বলেই ও পরিচিত। পোশাকি নাম জয়দীপ। থাকত বেলেঘাটার রাধামাধব দত্ত গার্ডেন লেনে। অভাবের সংসার। পুরসভার অস্থায়ী কর্মী ছিল ও। কিন্তু কাজে তো মন নেই। সে তো কবেই কেড়ে নিয়েছে লাল-হলুদ আবেগ।
২০১৯’এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে বেজি। আই লিগের স্বাদ তখনও অধরা। এরিয়ান তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল, ‘দাদা, আমরা কি আর জিতব না? ওরা (মোহন বাগান সমর্থকরা) তো টিকতে দিচ্ছে না?’ বৃহস্পতিবার রাতে কিশোর ভারতী স্টেডিয়াম যখন লাল-হলুদ অনুরাগীদের উচ্ছ্বাসের সঙ্গী, মনের পর্দায় ভেসে উঠেছিল ওর মুখ। সত্যিই বেজির আত্মা এতদিনে শান্তি পেল।
ইস্ট বেঙ্গলের সুখদুঃখের সঙ্গী প্রদীপ দাস। সালকিয়ার বাঁধাঘাটের বাসিন্দা। মধ্য পঞ্চাশের এই সমর্থক জন্মান্ধ। একটাই আক্ষেপ, সংসারের জন্য কিছুই করতে পারেন না। বৃদ্ধা মা’ই এক্ষেত্রে ভরসা। সম্প্রতি এক দুর্ঘটনায় পা গুরুতর জখম হয়েছে। কিন্তু শুক্রবার সন্ধ্যায় গর্বের সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘চোখ নেই। পা-ও খারাপ। জীবনের একমাত্র আলো ইস্ট বেঙ্গল। আমার, হ্যাঁ আমার ক্লাব আইএসএল জিতেছে। দেখতে পাই না তো কী? কানই আমার চোখ।’ সত্যিই তাই, মাঠে গিয়ে তাঁর সঙ্গী আবহই। পাশের সমর্থকরা চিৎকার করলে বোঝেন, দল গোল করার মত পরিস্থিতি তৈরি করেছে। আর চারপাশ নিশ্চুপ হলে মনের মধ্যে জড়ো হয় আশঙ্কা। ইস্ট বেঙ্গল গোল হজম করছে না তো? এদিন মুঠোফোনের ওপার থেকে প্রদীপবাবু ভাঙা গলায় গেয়ে উঠলেন, ‘ইতিহাস সাক্ষী হল, পায়ে পায়ে স্বপ্ন এল/ কাঁটাতার টপকাল ফুটবল/ রক্তে ছিল যে লাল জ্বলল হলুদ মশাল/ ফেলে আসা স্মৃতিটা সম্বল...’।
প্রদীপবাবুর মতই সপ্তম স্বর্গে ভাসছেন বাঘাযতীন ফুলবাগানের গণেশ দাস। বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। দুটো পা ছোটো। অসাড়ও। হাঁটতে-চলতে পারেন না। কিন্তু শারীরিক সমস্যা কখনোই ইস্ট বেঙ্গল প্রেমে অন্তরায় হতে পারেনি। খুব ইচ্ছে ছিল, বৃহস্পতিবার মাঠে যাওয়ার। কিন্তু টিকিট পাননি। অগত্যা টিভি’ই ভরসা। হাতে চালানো হুইলচেয়ারে বসে কোনোরকমে ধূপকাঠি বিক্রি করেই বিকেলে স্থানীয় মন্দিরে পুজো দেওয়া। মা শীতলার কাছে একটাই চাওয়া, ইস্ট বেঙ্গল মায়ের যেন সম্মানহানি না হয়। রশিদের জয়সূচক গোলের পর কেঁদে ফেলেন গণেশ। বলছিলেন, ‘ডায়মন্ড ম্যাচে প্রথম মাঠে যাওয়া। লাল-হলুদ রং আমার প্রাণ। ২২ বছর পর দেশের সেরা লিগের ট্রফি ইস্ট বেঙ্গল তাঁবুতে। আর কী চাই!’