Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

পরিচারিকা থেকে মন্ত্রী, কলিতার কথা বলতে গিয়ে আনন্দাশ্রু গৃহকর্তাদের

কলিতা মাজির পরিচারিকা থেকে মন্ত্রী হওয়ার গল্পে গৃহকর্তাদের আনন্দ। পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করেছে কলিতা। বিস্তারিত পড়ুন।

পরিচারিকা থেকে মন্ত্রী, কলিতার কথা বলতে গিয়ে আনন্দাশ্রু গৃহকর্তাদের
  • ৩ জুন, ২০২৬ ০৪:০০

সুখেন্দু পাল, বর্ধমান:  সাত-আট বাড়ির কাজ। ভোর থেকেই দৌড়ঝাঁপ। এক বাড়িতে রান্নাবান্না তো অন্য বাড়িতে গৃহস্থালীর যাবতীয় কাজ সামলানো। মাসের শেষে সব বাড়ি থেকে ৫০ টাকা করে প্রাপ্তি। বিয়ের পর থেকেই কলিতা মাজির এটাই ছিল রোজনামচা। সেই পরিশ্রমী পরিচারিকার আজকের ‘ধন্যি মেয়ে’ হয়ে ওঠার গল্প শোনাতে গিয়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না ওইসব গৃহকর্তা কিংবা মালকিনরা। অবশ্যই তা আনন্দাশ্রু। 

Advertisement

আনন্দ তো হবেই। বাড়ির কাজকর্ম নিয়ে যাঁকে হয়তো একদিন বকাঝকা করেছেন। মান-অভিমান হয়েছে। আবার স্নেহ-ভালোবাসায় আগলেও রেখেছেন, সেই পরিচারিকা আজ মন্ত্রী। লালবাতি এসি গাড়িতে তিনি ঘুরবেন। সঙ্গে চার-পাঁচজন দেহরক্ষী। অনেকটা ‘রূপকথা’র নায়িকার মতো! ভাবলেই যেন একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে যান প্লাটিলাল পাত্র, কৃষ্ণা পাত্ররা। তাঁদের বাড়িতে কাজ করতে করতেই তো রাজনীতিতে আসা। পরিশ্রম আর সততার জোরে লড়াইয়ের ময়দানে টিকে থাকা। তাই আজ সকলেই মুখর কলিতার উত্থানে। 
গুসকরা পুরসভার তিন নম্বর ওয়ার্ডের মাঝপুকুরে কলিতাদের ছোট বাড়ি। পাশেই থাকেন প্লাটিলাল পাত্র। প্রতিবেশীও বলা চলে। তাঁর বাড়িতে দীর্ঘ বছর কাজ করতেন কলিতা। এরমধ্যেই আকস্মিক মৃত্যু হয় প্লাটিলালের মেয়ের। যন্ত্রণা-বিধ্বস্ত বাবার পাশে দাঁড়ান তিনি। প্লাটিলালকে বাবা বলে ডাকতে শুরু করেন কলিতা। মন্ত্রী হয়েও সেই ডাক ছাড়েননি তিনি। প্লাটিলালও নিজের মেয়ের বলে পরিচয় দেন কলিতাকে। মঙ্গলবার বাড়িতে বসে বৃদ্ধ বলছিলেন, ‘আমি যে কি বলব, বুঝতে পারছি না। মেয়েকে হারিয়ে আমি আর এক মেয়েকে পেয়েছি। ওর সাফল্যে আমি গর্বিত। নিষ্ঠা, পরিশ্রম আর সততা থাকলে যে  অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়, সেটা কলিতা দেখিয়ে দিয়েছে।’ 
মন্ত্রী হয়ে ব্যস্ততা বেড়েছে কলিতার। প্লাটিলাল ভেবেছিলেন, ফোন করলে ‘মেয়ে’ ফোন ধরবে কি না। তাই খানিকটা ভয় নিয়েই ফোন করেছিলেন। ওপ্রান্ত থেকে আগের মতোই স্বাভাবিক কথা বলে গেলেন মন্ত্রী। চোখের জল মুছে প্লাটিলাল বললেন,‘আমার মেয়ে আমাকে ভোলেনি। কেমন আছি, কি খেয়েছি, জানতে চাইল।’ কলিতাও বলছিলেন, ‘অতীতকে ভুলি কি করে? শিকড়কে কখনও ভুলতে নেই। আজ আমার সুদিন ঠিকই। কিন্তু যাঁরা আমার দুর্দিনে পাশে ছিলেন, তাঁদের স্নেহ-ভালোবাসা আমি ভুলতে পারব না।’ 
কিছুদিন আগে পর্যন্ত কলিতা কাজ করতেন কৃষ্ণা পাত্রের বাড়িতে। বেশ কয়েকবছর ধরেই কৃষ্ণার সংসারের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। অত্যন্ত কাছ থেকে দেখেছেন কলিতাকে। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কৃষ্ণাদেবী বলছিলেন, ‘অত্যন্ত ভালো মেয়ে। প্রশ্নাতীত সততা রয়েছে ওঁর মধ্যে। আমাদের বাড়িরই একজন হয়ে উঠেছিলেন কলিতা। আজ উনি মন্ত্রী। কি যে আনন্দ হচ্ছে, বলে বোঝাতে পারব না। ওঁর সঙ্গে আমাদের আগের মতোই সম্পর্ক রয়েছে। আগামী দিনেও থাকবে।’ শুনে কলিতাও বললেন,‘আমি অতীত আঁকড়ে থাকতেই স্বচ্ছন্দ।’
মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ এক পড়শি বলছিলেন, ‘ওঁকে যতটুকু জানি ও চিনি তারউপর ভর করে বলতে পারি উনি বদলে যাওয়ার নয়। নিজে খুব অভাবের মধ্যে বাপের বাড়িতে বড় হয়েছেন। স্বামীর সংসারে এসেও চরম অনটনের মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। কিন্তু, কোনো প্রতিবন্ধকতা দমাতে পারেনি কলিতাকে।’

সম্পর্কিত সংবাদ