সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দীর্ঘমেয়াদি মৈত্রীর উজ্জ্বল সম্ভাবনা। আর তারপরই অন্ধকারের ছায়া? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং শনিবার বিকালে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সারলেন। দুই দেশের মধ্যে সবথেকে বড়ো যে সংঘাত, সেই সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধানের রোডম্যাপ তৈরি নিয়েও সহমত হলেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শনিবার নৈশভোজে নেই জিনপিং। রহস্যজনকভাবে। অথচ, এই ডিনারে প্রত্যেক রাষ্ট্রপ্রধানকে অনেক আগেই আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন মোদি। রাশিয়া, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা সহ উপস্থিত ২৪ দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও প্রতিনিধিরা। তাহলে জিনপিং অনুপস্থিত কেন? চীন আগাম কিছু জানায়নি। পরেও কোনো উচ্চবাচ্য নেই। মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর চীনের প্রেসিডেন্ট নিজের হোটেলে ফিরে গেলেন। আর একজন এই গালা ডিনারে হাজির ছিলেন না—আবু ধাবির ক্রাউন প্রিন্স। তিনি কিন্তু অনেক আগেই জানিয়ে রেখেছিলেন, শনিবারই তাঁকে ফিরতে হবে।
নৈশভোজে জিনপিংয়ের অনুপস্থিতি ছিল প্রথম পর্ব। আর দ্বিতীয় পর্ব দেখা গেল রবিবার, সম্মেলনের সমাপ্তি দিবসে। শুরুর ভাষণে নরেন্দ্র মোদি একের পর এক বাক্যবাণে উগরে দিলেন চীনের প্রতি ক্ষোভ। অদৃশ্যভাবে। প্রথম দিন রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদের দাবি তুলেছিলেন জিনপিংয়ের সামনেই। খোঁচা ছিল চীনকে। ব্রিকস যে যৌথ ঘোষণাপত্র গ্রহণ করেছে, সেই দিল্লি ডিক্লারেশনে পাকিস্তানের নাম না করেও সন্ত্রাস, পহেলগাঁও, রাষ্ট্রের জঙ্গিমদতের নিন্দা করা হয়েছিল। এটাও জিনপিংয়ের পছন্দ হওয়ার কথা নয়। কারণ পাকিস্তান চীনের প্রশ্রয় পায় সর্বদাই। আর রবিবার মোদি বললেন, ‘যেসব কালান্তক রোগ সংক্রামক, তার উৎপত্তি ও প্রাদুর্ভাব নিয়ে আগাম সতর্ক করা দরকার বলে ব্রিকসের বৈঠকে সকলেই সহমত হয়েছে।’ মুখে না বললেও তাঁর ইঙ্গিত করোনার দিকেই। এরপরই মোদির আক্রমণ রেয়ার আর্থ, ক্রিটিকাল মিনারেলসের মতো খনিজ সাপ্লাই নিয়ে। তিনি বলেন, ‘রেয়ার আর্থ, ক্রিটিকাল মিনারেলস, প্রযুক্তিকে কোনো দেশ যেন অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার না করে।’ এই মন্তব্যের পিছনেও চীনই লক্ষ্য। কারণ, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতির জেরে চীন মাঝেমধ্যেই গোটা বিশ্বে ক্রিটিকাল মিনারেলসের সাপ্লাই চেইন একাধিকবার বন্ধ করেছে। যাকে বলা হয় বাণিজ্য ব্ল্যাকমেল। বৈদ্যুতিক গাড়ি, সেমিকনডাকটর, ব্যাটারি তৈরিতে এই খনিজের চাহিদা বিশ্বজুড়ে। লাদাখের সীমান্ত সংঘাত, চীনের আগ্রাসন নিয়ে মোদি নীরব—এই অভিযোগে সরব হয়েছে বিরোধীরা। বারবার। তাহলে ব্রিকসের মঞ্চকেই মোদি কেন চীনের চোখে চোখ রেখে কথা বলার জন্য বেছে নিলেন? শুরু হয়েছে জল্পনা।
অথচ, রবিবার চীনের প্রেসিডেন্ট কিন্তু মোদির সুরেই গ্লোবাল সাউথের অধিকার আদায়ের দাবি তুলেছেন। বলেছেন, ‘গ্লোবাল সাউথের দেশগুলির যে অধিকার বিশ্বনীতি নির্ধারণে পাওয়া উচিত, তা এবার দিতে হবে। গ্লোবাল সাউথ এবং ব্রিকস এখন এমন গোষ্ঠী, যা আগামী দিনে বিশ্বের শক্তি নির্ধারণ করবে।’ এই বক্তব্য কিন্তু মোদিরই ভাষণের প্রতিধ্বনি। তারপরও ব্রিকস সম্মেলনের শেষবেলায় গুঞ্জন এবং চর্চার শিখরে একটিই ইস্যু—জিনপিং কেন মোদির ডাকা সরকারি ডিনার বয়কট করলেন? কূটনীতিতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাই ‘ভারত বনাম চীনের’ পরিবর্তে চর্চা যখন ‘ভারত এবং চীনের’ দিকে এগচ্ছিল, ঠিক তখন উঠল প্রশ্ন। ফোটো সেশনের আড়ালে গোপন কোনো সংঘাত দানা বাঁধেনি তো?