রাজদীপ গোস্বামী, মেদিনীপুর: সরকারি খাস জমি বিক্রির জন্য তৈরি হতো জাল নথি। আর সেই নথি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে একাধিকবার পরিচিতদের দিয়ে ‘হাত বদল’ করিয়ে নিতেন তৃণমূল নেতারা। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার জমি কেলেঙ্কারির তদন্তে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। সামনে আসছে একাধিক প্রভাবশালীর নামও। যাঁরা ‘মেঘনাদ’ হয়ে গোটা প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতেন। নিজেদের মধ্যে কথা চালাচালি করতেন সোশ্যাল মিডিয়ার একটি অ্যাপের মাধ্যমে। সেখানে ফোন, মেসেজে কথাবার্তা বলতেন। গোটা বিষয়টি এমনভাবে সাজানো হতো যে, শেষ পর্যন্ত জমির আসল মালিককে খুঁজে বের করাই হয়ে উঠত কঠিন।
তদন্তকারী একটি সূত্রের দাবি, ভুয়ো নথি তৈরি করে প্রথমে সরকারি জমি এমন এক ব্যক্তির নামে রেকর্ড করা হতো, যার বাস্তবে কোনও অস্তিত্বই নেই। এরপর সেই জমি একাধিকবার বিক্রি করা হতো। প্রতিবারই তৈরি হতো নতুন নথি। ক্রেতারা মনে করতেন, যেহেতু জমির আগেও অনেকজন মালিক ছিলেন, তাই সেটি বৈধ। আর এই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই চলত কোটি টাকার কারবার।
গত ৬ জুন রাতে গ্রেপ্তার হন মেদিনীপুর সাংগঠনিক জেলা তৃণমূলের সভাপতি সুজয় হাজরা। পরদিন, অর্থাৎ ৭ জুন প্রথমবার প্রকাশ্যে আসে জমি কেলেঙ্কারির বিষয়টি। শুরুতেই তদন্তে উঠে আসে, এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে শুধু সুজয় জড়িত নন। একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির যোগ থাকতে পারে। তারপর থেকেই একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে। তদন্তকারী অফিসারদের একাংশের দাবি, গোটা প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। জাল নথি তৈরির পর স্থানীয় কিছু পরিচিত ব্যক্তিকে বিক্রি করতে চক্রের মাথারা। এক একটি জমি তিনবার পর্যন্ত বিক্রি করা হয়েছে। ক্রেতারা মাথাদের অত্যন্ত পরিচিত। শেষে বাইরের কোনো ক্রেতা যখন জমি কিনতে আসতেন, তখন তাঁর সন্দেহ করার তেমন কোনো কারণ থাকত না। দলিল-দস্তাবেজে একাধিক মালিকের নাম, রেকর্ডে একাধিক পরিবর্তন—সব মিলিয়ে জমিটি বৈধ বলেই মনে করতেন তাঁরা। তদন্তকারী এক অফিসার বলছিলেন, ‘শুরুতে জমি হাতবদল হতো স্থানীয়দের মধ্যে। পরে সুবিধাজনক সময়ে বাইরের ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হতো। এতে যেমন মোটা অঙ্কের কমিশন মিলত, তেমনই ক্রেতারাও বুঝতে পারতেন না যে তাঁরা আসলে সরকারি জমি কিনছেন।’ সূত্রের খবর, এই পুরো প্রক্রিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থাও ছিল অত্যন্ত গোপনীয়। সরাসরি ফোনে খুব কমই কথা বলতেন চক্রের মাস্টার মাইন্ডরা। পরিবর্তে ব্যবহার করা হতো বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপের কলিং ব্যবস্থা। তদন্তকারীদের অনুমান, নজর এড়াতেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি নিজেরা গোপনে বৈঠকও করতেন। সূত্রের খবর, স্থানীয় বিভিন্ন হোটেলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসত সেই বৈঠক। সেখানেই পরিকল্পনা নেওয়া হতো। কোথায় কত পরিমাণ জমি রয়েছে, কীভাবে নথি তৈরি করতে হবে, কার মাধ্যমে হাত বদল হবে—সবকিছুই ঠিক হতো ওই বৈঠকে। এক তদন্তকারী অফিসারের কথায়, ‘সরকারি জমি আত্মসাৎ চক্রের জাল অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। অত্যন্ত চালাকির সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো। গ্রামবাসীদের কেউ আপত্তি করলে তাঁকে নানাভাবে চুপ করিয়ে দেওয়া হতো।’
মেদিনীপুরের বিজেপি বিধায়ক শংকর গুছাইত বলেন, ‘পুলিশ তদন্ত করছে। আইনের শাসন চলছে। কেউ যদি অন্যায় করে থাকে, সে যে দলেরই হোক না কেন, আইন তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।’ অন্যদিকে, তৃণমূল নেতা মহম্মদ রফিক বলেন, ‘পুলিশ তদন্ত করছে। কেউ দোষ করলে অবশ্যই শাস্তি পাবে।’ মেদিনীপুরের বাসিন্দা তন্ময় দাস বলেন, ‘কেউ যেন সেটিং করে বাদ না পড়েন।’