Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

ড্রাইভার-খরায় গ্যারাজে পড়ে ফরচুনার, স্করপিও, বেশি বেতনেও তৃণমূল নেতাদের গাড়ির স্টিয়ারিং ধরতে নারাজ

এলাকায় যে তাঁর আলাদা প্রভাব, তা তৃণমূল নেতাদের দামি গাড়ি দেখলেই বোঝা যেত। কালো কাচ তোলা ঝাঁ চকচকে বিলাসবহুল গাড়ি মানেই ‘দাদা’ যাচ্ছেন।

ড্রাইভার-খরায় গ্যারাজে পড়ে ফরচুনার, স্করপিও, বেশি বেতনেও তৃণমূল নেতাদের গাড়ির স্টিয়ারিং ধরতে নারাজ
  • ২১ মে, ২০২৬ ০৪:০০

শ্যামলেন্দু গোস্বামী, বারাসত: এলাকায় যে তাঁর আলাদা প্রভাব, তা তৃণমূল নেতাদের দামি গাড়ি দেখলেই বোঝা যেত। কালো কাচ তোলা ঝাঁ চকচকে বিলাসবহুল গাড়ি মানেই ‘দাদা’ যাচ্ছেন। গাড়ির সামনে ও পিছনে এক ঝাঁক বাইক, মোড়ে মোড়ে অনুগামীদের ভিড়। সেই সময় মাসে ১৫ হাজার টাকা বেতনে নেতাদের গাড়ি চালানোর জন্য লাইন পড়ে যেত ড্রাইভারদের। কারণ শুধু বেতন নয়, নেতার গাড়ির স্টিয়ারিং ধরার সঙ্গে জুড়ে থাকত আলাদা দাপট, পরিচিতি এবং নানা ‘সুবিধা’ও। কিন্তু, ২০২৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনের পর পালাবদল হতেই সেই ছবি পুরো বদলে গিয়েছে। এখন বারাসত থেকে বসিরহাট, তৃণমূল নেতাদের নতুন সংকট— গাড়ি আছে, কিন্তু চালক নেই। গ্যারাজে ধুলো খাচ্ছে কয়েক লক্ষ টাকার ফরচুনার, স্করপিও।

Advertisement

আগে চালকরা কেউই নেতাদের গাড়ি চালানোর ডাক ফিরিয়ে দিতে পারতেন না। বরং এমন ডাক পেলে যেন বর্তে যেতেন তাঁরা। মাসে ১৫ হাজার টাকায় কাজ করতে রাজি হয়ে যেতেন অনেকেই। কারও কারও মতে, রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আবার সরাসরি ‘না’ বলতে পারতেন না অনেকেই। এখন পরিস্থিতি পালটেছে। মাসে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতনের প্রস্তাব দিয়েও নাকি চালক পাচ্ছেন না তৃণমূলের নেতারা। আসলে কেউই ঘাসফুলের নেতাদের গাড়ি চালানোর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। তৃণমূল নেতারা এনিয়ে আক্ষেপের কথা শোনাচ্ছেন চায়ের দোকান থেকে একান্ত আলোচনায়। সঙ্গে ফেলছেন দীর্ঘ নিঃশ্বাসও! নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বারাসতের এক তৃণমূল নেতা বলেন, ‘আগে ড্রাইভার পাওয়া নিয়ে কখনও ভাবতে হয়নি। একজনকে ডাকা হলে তিনজন ছুটে আসত। আর এখন তিনজনকে ফোন করলেও তাঁদের কেউই রাজি হচ্ছেন না। সটান বলে দিচ্ছেন, ‘তৃণমূল নেতাদের গাড়ি চালাব না।’ কারণ জানতে চাইলে বলছেন, ‘ঝুঁকি নিয়ে কাজ করব না। কোথাও গাড়ি ভাঙচুর হলে, আমার কিছু হলে তার দায় কে নেবে?’ এটা নতুন অভিজ্ঞতা বলেই দাবি ওই তৃণমূল নেতার। 
বসিরহাট শহরের প্রথম সারির এক দাপুটে নেতা বলছেন, মাসে ২৫ হাজার টাকা বেতন দেব বলেছি, তাও রাজি হচ্ছেন না কেউ। আমি শুধু তৃণমূল করি না, অন্যান্য ব্যবসাও আছে। এই অবস্থায় গাড়ির চালক না পেলে কাজকর্ম তো শিকেয় উঠবে। প্রয়োজনে বাড়ির সদস্যরাও গাড়ি নিয়ে কোথাও যেতে পারবেন না। স্থানীয়দের দাবি, ভোটে ভরাডুবির পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। একের পর এক নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ, গ্রেপ্তারি— এই আবহে অনেক চালকই এখন তৃণমূল নেতাদের গাড়ি চালাতে অনীহা দেখাচ্ছেন। তাঁদের আশঙ্কা, কোনো ঝামেলায় নাম জড়িয়ে যেতে পারে।
এই প্রসঙ্গে আমডাঙার এক গাড়িচালক ঝন্টু মণ্ডলের বক্তব্য, ‘আগে তৃণমূল নেতাদের গাড়ি চালালে থানায় সুবিধা হতো। পুলিশ চিনে যেত। এখন উলটে পুলিশ বেশি বেশি প্রশ্ন করে। শুধু তাই নয়, নেতাদের গাড়ি চালানোর কথা জানতে পারলে আগামী দিনে টার্গেটও হতে পারি। তাই অনেকে এই পরিস্থিতিতে অ্যাপ-ক্যাব বা ব্যক্তিগত গাড়ি চালানোকেই নিরাপদ বলে মনে করছেন। মাসে ৩০ হাজার টাকা দিলেও এখন জীবনের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না ড্রাইভাররা। নেতাদের অনুরোধ ফিরিয়ে দিয়ে এখন পাড়ার এক দাদার গাড়ি চালাচ্ছি আমি।’

সম্পর্কিত সংবাদ