শোভন চন্দ, কলকাতা: ‘শ্মশানে মশানে ফেরে ভোলা মহেশ্বর/তার কোলে আমার উমা কেমন করে রয়?/বাঘ ছাল পরিধান, গায়ে মাখে ছাই/জামাইয়ের ভাঙের নেশায় হুঁশ-জ্ঞান নাই...’ উদাসীন জামাইকে নিয়ে উমার বাপের বাড়ির অভিযোগ চিরকালের। এ নিয়ে বাংলায় লোকগান, ব্রতকথারও অন্ত নেই। তবে বিস্তর অভিমান, অভিযোগের পরও হরগৌরীর আদর-আপ্যায়নে ত্রুটি থাকে না বাঙালির। কলেজ স্ট্রিটের কাছে ৩, বিধান সরণির দ্বারিকা ভবনে এমনই অপূর্ব দৃশ্যের সন্ধান মেলে। ঠনঠনিয়া কালীমন্দির থেকে কয়েক পা হাঁটলে দত্তবাড়ির দালান। সেখানে উমার অন্য রূপ। সেখানে কৈলাস থেকে শিবের কোলে চেপে মর্ত্যে আসেন উমা। মহিষাসুরমর্দিনী নন, এখানে তিনি কন্যা রূপে পূজো পান।
ভরা শরতেও বৃষ্টি খামখেয়ালি। হাতে আর সময় কোথায়? আর কয়েক দিন মাত্র। দালান থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে ফের কাজে লেগে পড়লেন শিল্পী। ঘাড় বাঁকিয়ে বারবার দেখে নিচ্ছেন, শিবের গোঁফটা মনের মতো হল কি না। এই ফাঁকে বাড়ির ষষ্ঠ প্রজন্ম দেবজ্যোতি দত্ত এলেন পুজোর ইতিহাস নিয়ে। ঠনঠনিয়ায় দত্তবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা সুবর্ণ বণিক দ্বারিকানাথ দত্ত ছিলেন ব্যবসায়ী। তাঁর বেশ খ্যাতি ছিল। একসময় দ্বারিকনাথ ঠিক করেন পুজো করবেন। কিন্তু বৈষ্ণব পরিবারে শক্তি আরাধনার তেমন কোনো রীতি নেই। শেষমেশ পণ্ডিতদের পরামর্শ নিয়ে পুজো শুরু হল। এমন মূর্তি তৈরি হল, যার মধ্যে প্রেমভাব থাকবে। সেইমতো শিবের কোলে জায়গা পেলেন উমা। অস্ত্র, অসুর বা রণংদেহি মূর্তি নয় তাঁর। বদলে শান্ত, স্নিগ্ধ রূপ। ১৮৫০ সালে ঠনঠনিয়া এলাকায় দত্তবাড়ি তৈরি হয়েছিল। আর পুজো শুরু হয়েছিল ১৮৫৫ সালে। এবার ১৭১ বছরে পড়ল।
এই বাড়িতে পুজোর সংকল্প হয় মেয়েদের নামে। নবমীতে বাড়ির মহিলাদের মাথায় করে ধুনো পোড়ানোর রীতি রয়েছে। নবমীর দিন কুমারীর সঙ্গে সধবা পুজোও হয়। শোনা যায়, দ্বারিকানাথের বিয়ের পর ব্যবসায় ব্যাপক উন্নতি হয়। সেই থেকে মহিলাদের প্রাধান্য দিয়েই পুজোর আয়োজন। এখানে অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে দেবীকে চামুণ্ডারূপে পুজো করা হয়। চামুণ্ডার পুজোয় রক্ত ও মাংস লাগে। কিন্তু বৈষ্ণব ঘরে তা সম্ভব নয়। অনেক আলোচনার পর একটা উপায় বের করে এই পরিবার। পুজোয় মাসকলাইয়ের ডাল ভোগ হিসাবে দেওয়া হল। হিন্দি শব্দে মাস শব্দের অর্থ মাংস। আর তার সঙ্গে যোগ করা হয় রক্তচন্দন। এভাবেই তৈরি হয় রক্ত ও মাংস। এই বাড়ির পুজোয় আতপ চাল ও বাটা চিনির বিশেষ নৈবেদ্য দেওয়ার রীতি আছে।
নবমী পেরিয়ে দশমী দেখতে দেখতে চলে আসে। দত্তবাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে স্বামী ও ছেলেপুলেদের নিয়ে কৈলাসে পাড়ি দিতে হয় উমাকেও। শূন্য দালান খাঁ খাঁ করে গোটা একটা বছর। ‘এবার আমার উমা এলে, আর উমা পাঠাব না...’ দত্তবাড়ির রেডিয়োতে এই গানটা বাজবেই বাজবে এ সময়, ফি বছর।



