আরশোলাকে ভয় পেত পিটার থঙ্গরাজ
আরশোলাকে ভয় পেত পিটার থঙ্গরাজ
অরুময়নৈগম: বেঙ্গালুরুতে আমার ব্যালকনির বাইরে তাকালে মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। বেশ ছিমছাম। গাছগাছালিতে ঘেরা। বিকেলের দিকে নানা পাখির ডাকে স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়ি। জীবনের গোধূলি বেলায় পুরনো কথার ভিড়। কলকাতার ফুটবল, প্রিয় মোহন বাগান ক্লাবে বন্ধু চুনীর সঙ্গে আড্ডা। সমর্থকদের ভালোবাসায় মোড়া সোনালি অতীত। ড্রইং-রুমের একপাশে ছয় দশক আগের একটা ছবি বহু যত্নে সাজানো। ১৯৬২ সালে জাকার্তায় ভারতীয় দলের সোনার ফ্রেম। এশিয়াডে সোনা জেতার পর উপহার দিয়েছিলেন এক পরিচিত। এ শুধু ছবি নয়, আমার কলিজার টুকরো। ফুটবলার না হলে কে চিনত অরুময়নৈগমকে?
ছয়ের দশক ভারতীয় ফুটবলের স্বর্ণযুগ। পিকে, চুনী, অরুণ, বলরাম, আঙ্কেল (থঙ্গরাজ) আরও কত নাম। মাঠের বাইরেও বন্ডিং ছিল দেখার মতো। প্রায় সাড়ে ছ’ফুট লম্বা থঙ্গরাজ। এক হাতে বল গ্রিপ করা কোনও ব্যাপার নয়। অথচ আরশোলা দেখলে বাচ্চা ছেলের মতো ভয় পেত ও। একবার মজা করার জন্য ওর বিছানার নীচে আরশোলা ছেড়ে দিয়েছিলাম। গভীর রাতে লাফাতে লাফাতে ঘর ছেড়েছিল থঙ্গরাজ। ওদিকে আসর জমাতে পিকের জুড়ি নেই। আলপিন টু এলিফ্যান্ট, সব বিষয়ে অগাধ জ্ঞান। বন্ধু চুনী অসাধারণ ড্রিবলার। খেলার ধরন ইউরোপিয়ানদের মতো। চুনীর জনপ্রিয়তার কাছে সিনেমাপাড়ার তারকাও ম্লান। যাই হোক, এশিয়াডের কথায় আসি। টুর্নামেন্টের আগে দল পাঠানো নিয়ে একরাশ অনিশ্চয়তা। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সবুজ সংকেত মেলে। স্বীকার করতে অসুবিধা নেই, দলের সাফল্য নিয়ে ফেডারেশন কর্তারাও সন্দিহান ছিলেন। প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হারতেই ঝাঁপিয়ে পড়েন সমালোচকরা। কারা খেলছে ভারতের জার্সিতে? তবে কোচ রহিম সাহেব অকুতোভয়। জানতেন, এই দল ঘুরে দাঁড়াবেই। আসলে একঝাঁক প্রতিভাবান ফুটবলার নিয়ে দল গড়েছিলেন হায়দরাবাদি কোচ। কোনও কিছুর সঙ্গে আপোস করেননি। ফাইনালের আগে সেই রহিম সাহেবও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। চোখের কোণে চিকচিকে জল। সেই দৃশ্য কখনও ভুলব না। বলতেই হবে জার্নেলের কথা। চীনের প্রাচীরের মতো রক্ষা করেছিল ডিফেন্স।
জাকার্তার মাঠ ছাড়ি সোনার পদক গলায় ঝুলিয়ে। টিম বাসে ওঠার আগে আমাদের জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছিলেন এক সমর্থক। মনে আছে, তেরঙা পতাকা কপালে ছুইয়ে প্রণাম করেছিল পিকে। সেই পদক, জাতীয় দলের ব্লেজার পরম যত্নে আগলে রেখেছে পরিবার। ছেলে ক্রিস্টোফার আমার অন্ধের যষ্টি। অফিস থেকে ফিরে ফুটবলের গল্প শোনায় এই বৃদ্ধকে। ছেলের আব্দারেই ময়দানের স্পেশাল স্ক্রিনিংয়ে হাজির হয়েছিলাম। তবে শরীর অসুস্থ। শব্দ, আলো বেশিক্ষণ সইতে পারি না। সেদিন কিছুক্ষণ পরেই বাড়ি ফিরে আসি। তাতে অবশ্য আপশোস নেই। ৬৩ বছর আগের প্রতিটা মুহূর্ত মনের ডার্করুমে সাজানো। সেই নেগেটিভ আলোর মতোই উজ্জ্বল।
আবছা স্মৃতিতে আজও ঝলমলে রহিম সাহেব
অরুণ ঘোষ: আবছা স্মৃতি। পুরনো ডায়েরির পাতার মতোই ধূসর, আলগা। বেঁধে রাখা দুষ্কর। ড্রিবল করে ছিটকে যেতে চায়। আসলে বয়স হয়েছে তো! সবকিছুই কেমন ঘোলাটে। শীতের বেলার মতো জবুথবু। তবু সেপ্টেম্বর মানেই এক আকাশ রোদ। টাইম মেশিনে চড়ে কয়েক দশক পিছিয়ে যাওয়া। ১৯৬২’র জাকার্তা। রহিম সাহেবের কোচিংয়ে ভারতীয় ফুটবলের সূর্যোদয়। দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়ে এশিয়াডে সোনা জয়। সাদা-কালো ফ্রেমের ছবিগুলো হাতের সামনে এনে দেয় মেয়ে সুগতা। এ তো আজীবনের সম্পদ। চোখ বুজলেই দেখতে পাই রহিম সাহেবকে। ওই তো ঠোঁটের কোণে জ্বলছে সিগারেট। ক্যান্সারে আক্রান্ত ফুসফুস নিবু নিবু। তবু দু’চোখে লাল টুকটুকে স্বপ্ন। কাঁপা কাঁপা হাতেই প্রণাম করি গুরুকে।
জাকার্তা এশিয়াডের দলই কি ভারতের সর্বকালের সেরা একাদশ? অনেকেই প্রশ্ন করেন। একই আকাশে চুনী, পিকে, বলরাম। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। তার উপর জার্নেল, থঙ্গরাজ, অরুময়। সিংহের থাবার মতো পাঞ্জা। তবে সেরা অবশ্যই বলরাম। মুখে রা নেই। কিন্তু চষে ফেলত গোটা মাঠ। আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছি বোধহয়। বাবার চোখে জল দেখে আদর করে মুছিয়ে দেয় মেয়ে। ওর হাতের মুঠোয় শক্ত করে জড়ানো আমার আঙুল। অব্যক্ত বেদনা গুমরে মরে। কোথায় গেল সেই সোনালি দিন। বন্ধু পিকে অনর্গল। ড্রেসিং-রুম মাতাতে জুড়ি নেই। মাথায় সেলাই নিয়েও লড়ে গেল জার্নেল। কপাল বেয়ে চুঁইছে পড়ে রক্ত। কুছ পরোয়া নেহি। প্রতিপক্ষের বুটের ডগায় মাথা পেতে দেবে সর্দার। ফুটবলের পাওয়ার হাউস। পাঞ্জাব থেকে নিয়ে আসত দেশি ঘি। দুধসর্বস্ব চায়ে মিশিয়ে নিত দু’চামচ ঘি। সতীর্থ নয়, ওরা আমারই আপনজনই। সেই দলে ভাঙন ধরেছে অনেকদিন। জীবনের ময়দান ছেড়ে না ফেরার ড্রেসিং-রুমে পাড়ি দিয়েছে বন্ধুরা। নিশ্চয়ই জমিয়ে ক্লাস নিচ্ছেন রহিম সাহেব।
বাড়ি থেকে বেরনো বন্ধ অনেকদিন। চার দেওয়ালই আমার পৃথিবী। একদিন মেয়ে জানায়, এশিয়াডে সোনা জয় নিয়ে তৈরি হয়েছে সিনেমা। প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। ভুল ভাঙল স্পেশাল স্ক্রিনিংয়ে। প্রবল অসুস্থতা সত্ত্বেও ছুটে যাই দেখতে। আদর, আপ্যায়নের ত্রুটি নেই। সেই জাকার্তা। পতপত করে উড়ছে গর্বের জাতীয় পতাকা। এশিয়াড ফাইনালে সামনে দক্ষিণ কোরিয়া। জার্নেলের গোলের পর হলের দর্শকদের গোল চিৎকারে সম্বিৎ ফেরে। রিল আর রিয়েল লাইফ মিলেমিশে একাকার। বাড়ি ফেরার আগে প্রণাম করে গেলেন অনেকেই। পরদিন সকালে শরীর বেশ ঝরঝরে। আমরা রহিম সাহেবের ছাত্র। জীবনযুদ্ধে যুঝতে যুঝতেও তিনি শিখিয়েছেন, হারার আগে হারতে নেই। লড়তে হয় মাথা উঁচু করে।
গ্রুপ-বি- ভারত-০ : দক্ষিণ কোরিয়া-২
(চুং, সুং)
থাইল্যান্ড-১ : ভারত-৪
(সুফো) (পিকে-২, চুনী, বলরাম)
ভারত-২ : জাপান-০
(পিকে, বলরাম)
সেমি-ফাইনাল- দক্ষিণ ভিয়েতনাম-২ : ভারত-৩ (ফান, ভিন) (চুনী-২, জার্নেল)
ফাইনাল- ভারত-২ : দক্ষিণ কোরিয়া-১
(পিকে, জার্নেল) (সুং)
প্রাক্তনদের মত
ভারতীয় ফুটবলের সেরা সাফল্য। কী দুরন্ত দল— প্রদীপদা, চুনীদা, বলরামদার মতো কিংবদন্তি। রক্ষণে অরুণ ঘোষ। আমার বিশ্বাস, সেই সময় ইউরোপের যে কোনও দলকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারত রহিম সাহেব-ব্রিগেড। আর এখন? ভারতের র্যাঙ্কিং ১৩৩! আসলে ফুটবলকে জনপ্রিয় করতেই ব্যর্থ ফেডারেশন। বরং ক্রমশই ভাটা পড়ছে উৎসাহে।
শ্যাম থাপা
এশিয়াডে সোনা জয় ভারতীয় ফুটবলে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ৪ সেপ্টেম্বর দিনটা ফেডারেশনের উদযাপন করা উচিত। এখনকার কর্তারা সেই ইতিহাস সম্পর্কে উদাসীন। আসলে চেয়ার দখলের রাজনীতিতে ফুটবলই তো ব্রাত্য। ৬২’র জাকার্তা এশিয়াডে দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়ে খেতাব জেতে ভারত। অথচ জাতীয় দল এখন বাংলাদেশকে টপকাতেও হিমশিম খায়। প্রাক্তন ফুটবলার হিসাবে এই অধঃপতন সত্যিই পীড়াদায়ক।
সুব্রত ভট্টাচার্য
রহিম সাহেবের সেই দলকে প্রণাম জানাই। খেলোয়াড়ি জীবনে প্রদীপদার মুখে সেই ইতিহাস শুনে গায়ে কাঁটা দিত। পিকে স্যার, চুনী গোস্বামীদের সান্নিধ্য পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের। পরবর্তীতে সেই জাকার্তার মাটিতেই আশিয়ান কাপ জেতে ইস্ট বেঙ্গল। তবে ব্যক্তিগত মত, ১৯৭০ সালের পর আন্তর্জাতিক মঞ্চে ক্রমশই পিছিয়েছে ভারত। শুধু বর্তমান প্রজন্মকে দোষ দিয়ে কোনও লাভ নেই।
দেবজিৎ ঘোষ