Bartaman Logo
১ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

তমলুকে রথযাত্রায় এবারই প্রথম থাকছে মেলার চমক

রথের কথা বললেই সবার আগে মেলা, নাগরদোলা সঙ্গে গরম পাঁপড়ভাজা, চপ, বেগুনির কথা মনে পড়ে। কিন্তু তমলুক শহরে মহাপ্রভু মন্দিরের রথযাত্রায় এতদিন মেলা ছিল না।

তমলুকে রথযাত্রায় এবারই প্রথম থাকছে মেলার চমক
  • ২৭ জুন, ২০২৫ ০৪:০০

নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: রথের কথা বললেই সবার আগে মেলা, নাগরদোলা সঙ্গে গরম পাঁপড়ভাজা, চপ, বেগুনির কথা মনে পড়ে। কিন্তু তমলুক শহরে মহাপ্রভু মন্দিরের রথযাত্রায় এতদিন মেলা ছিল না। এবার প্রথম রথযাত্রা উপলক্ষ্যে রাজবাড়ি ময়দানে মেলা বসছে। মাসির বাড়ি তথা তাম্রলিপ্ত রাজ পরিবারের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ২৭জুন থেকে ৫জুলাই পর্যন্ত এখানে মেলা, নাগরদোলা, পাঁপড়ভাজা সবই মিলবে। শুধু তাই নয়, এবার তমলুকের রথযাত্রা উপলক্ষ্যে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের প্রসাদ অন্তত ৫০হাজার ভক্তকে দেওয়া হবে। রথযাত্রা থেকে গুরুপূর্ণিমা পর্যন্ত মহাপ্রভু মন্দিরে চলবে উৎসব। ভক্তি আর নিষ্ঠায় পরিপূর্ণ এই রথযাত্রায় হাজার হাজার ভক্তের সমাগম হয়। দুই মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রাম থেকে বিপুল সংখ্যক ভক্ত মহাপ্রভু মন্দিরে চলে আসেন রথের দিনে। সুসজ্জিত রথের সঙ্গে তাঁরা নগর পরিক্রমা করেন। প্রাচীন এই শহরের মানুষও রথযাত্রা উৎসবে শামিল হন।

Advertisement

তমলুক শহরে গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু মন্দিরের এই রথ প্রায় ২৯৯বছরের পুরনো। একসময় রূপনারায়ণ নদের ধারে মাসির বাড়ি ছিল জগন্নাথদেবের। অনেক আগেই সেই মাসির বাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। রূপনারায়ণ দিয়েও অনেক জল বয়ে গিয়েছে। বহু বছর এই রথযাত্রা বন্ধ ছিল। ২০০২সাল থেকে আবারও নতুন উদ্যমে মহাপ্রভু মন্দিরের রথযাত্রা শুরু হয়। মাঝে দীর্ঘ সময় রথযাত্রা বন্ধ থাকায় মন্দিরে জগন্নাথের মূল বিগ্রহকে রথে চাপানো হয় না। জগন্নাথের বিজয় বিগ্রহ বের করা হয়। 
আলাদা আলাদা রথে চড়ে মাসির বাড়ি যাবেন জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রা। তার আগে এলাহি আয়োজন করা হয়। রথের দিন সকাল ৮টায় ৫৬ভোগ নিবেদন করা হয় দেবতাদের। সকাল ৯টায় দ্বাদশ ব্যাঞ্জন-সহ খিচুড়ি ভোগ। সকাল ১০টায় রাজভোগ নিবেদন করা হয়। মধ্যাহ্নভোজ শেষে দ্বিপ্রাহরিক বিশ্রাম। তারপর রথে চড়ে শোভাযাত্রা করে ভক্ত সহযোগে নগর পরিক্রমা করে রাজবাড়ির গুণ্ডিচা মন্দিরে যান জগন্নাথ, বলরাম আর সুভদ্রা। তমলুক শহরের নরপোতায় মন্দির থেকে প্রায় সাড়ে সাত কিলোমিটার নগর পরিক্রমা করে রথ পৌঁছায় তাম্রলিপ্ত রাজবাড়িতে(মাসির বাড়ি)। 
১৫১০ সালের ৩ফেব্রুয়ারি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু স্বয়ং তমলুক শহরে এসেছিলেন। তাঁর ভক্ত তথা অন্তরঙ্গ পার্ষদ মেদিনীপুরের আদিকবি বাসুদেব ঘোষ তমলুকে থাকতেন। শ্রীচৈতন্য ও তাঁর পার্ষদ বাসুদেব ঘোষের স্মৃতি বিজড়িত তমলুক শহরের এই মহাপ্রভু মন্দিরে মহাপ্রভু, জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা পূজিত হন। এবার এখানকার রথ ২৪বছরে পড়ল। কথিত আছে, ১৫১০সালে গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাস নেন গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু। সন্ন্যাস গ্রহণের পর তিনি দিন রাঢ়দেশে, ১৪দিন শান্তিপুরে থাকার পর নীলাচলের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন। ১৫১০ সালে ৩ফেব্রুয়ারি শুক্রবার পঞ্চমী তিথিতে ভোরে মহাপ্রভু তমলুকের প্রয়াগঘাটে পদার্পণ করেন। প্রাচীন তাম্রলিপ্তে এসে ভিক্ষাগ্রহণ করে, সংকীর্তন করে সপার্ষদ রাত্রিযাপন করেছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। মহাপ্রভুর অন্তরঙ্গ পার্ষদ বাসুদেব ঘোষ তমলুক শহরের যে জায়গায় ভজন কুঠি স্থাপন করে বসবাস করেন, পরবর্তীতে সেখানেই সমাধিস্থ হন। ওই স্থান নরপোতা নামে পরিচিত। সেখানেই গড়ে ওঠেছে মহাপ্রভু মন্দির। লোহার কাঠামো দিয়ে সুসজ্জিত তিনটি রথে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে আলাদাভাবে চাপিয়ে রথযাত্রা হবে। প্রতিটি রথের সঙ্গে আলাদা বর্ণাঢ্য দল যোগ দেয়। তমলুক পুরসভা, বর্গভীমা মন্দির, বড়বাজার, নিমতলা, হাসপাতাল মোড়, মানিকতলা হয়ে রাজবাড়ি পর্যন্ত রথ টানা হবে। এই রথযাত্রায় হাজার হাজার ভক্ত শামিল হন। ভক্তি আর আবেগের টানে শহরের রাস্তার দু’প্রান্তে মানুষের ঢল নামে। উল্টো রথের দিন ঠিক উল্টো পথে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা মন্দিরে ফিরে আসেন।
গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু মন্দিরের সেবাইত গৌরকিশোরানন্দ দেবগোস্বামী বলেন, উৎকল সংস্কৃতির সঙ্গে এখানকার রথযাত্রার মিল রয়েছে। এবার ঝাড়খণ্ড থেকে কীর্তনের দল, ওড়িশা থেকে পাঠক, প্রবচক এবং বৃন্দাবন থেকে কয়েকজন মহারাজ আসবেন। এবার রথযাত্রা উপলক্ষ্যে প্রায় ৫০হাজার ভক্তকে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের প্রসাদ বিলি করা হবে।  ছবি: চন্দ্রভানু বিজলি

সম্পর্কিত সংবাদ