তন্ময় মল্লিক: আজ শনিবার, মহাপঞ্চমী। কাল রবিবার দেবীর বোধন। পঞ্জিকা মতে দুর্গাপুজো চারদিনের। কিন্তু বাংলায় মহালয়ার দিন থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছে পুজো মণ্ডপের উদ্বোধন। কারণ এ রাজ্যে দুর্গাপুজো এখন আর কেবল ধর্মীয় আচার পালনের মধ্যে আটকে নেই। দুর্গাপুজো এখন আক্ষরিক অর্থেই উৎসব। তাই মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে আপামর বাঙালি মেতে ওঠে প্রাণের উৎসবে।
উৎসব মানুষের মধ্যে দূরত্ব ঘোচায়। পরস্পরকে কাছে আনে। তাই উৎসব হয়ে ওঠে মিলনমেলা। কিন্তু উৎসবের মধ্যে যদি ঢুকে যায় রাজনীতি? তাহলে
দূরত্ব বাড়ে, নষ্ট হয় সম্পর্ক। রাজনীতির কারবারিরা গত কয়েক বছর ধরে উৎসবের মধ্যেও রাজনীতিকে টেনে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অনেকে মনে করেন, দুর্গাপুজো নিয়ে রাজনীতির পারদ চড়তে শুরু করেছে ২০১৮ সাল থেকে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেবারই প্রথম পুজো কমিটিগুলিকে অনুদান দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন। আর তাতেই প্রমাদ গুনেছিল বিরোধীরা। তারা বুঝেছিল, পুজোয় অনুদান দেওয়া ঠেকাতে না পারলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গায়ে পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু তোষণকারীর যে তকমাটা সেঁটে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, তা খসে পড়বে। তাই তারা সরকারি টাকা কেন এভাবে ‘বাজে খরচ’ করা হবে, সেই প্রশ্ন তুলেছিল। অনেকে সরকারি অনুদান আটকাতে ছুটেছিলেন আদালতে। কিন্তু লাভ হয়নি।
উনিশের লোকসভা নির্বাচনে বাংলায় বিজেপি ১৮টি আসনে জেতায় দিল্লির নেতারা ধরেই নিয়েছিলেন, বাংলা দখল স্রেফ সময়ের অপেক্ষা! সেই আশায় দিল্লির নেতারা বারবার এ রাজ্যে এসে বলেছিলেন, বাংলায় দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মীপুজো হয় না। তারজন্য আদালতের অনুমতি নিতে হয়। এসব কথা বলার উদ্দেশ্য, হিন্দুদের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি করা। তবে,
এই ধরনের প্রচার যত হয়েছে বিজেপির প্রতি
বাংলার মানুষের অবিশ্বাস ততই বেড়েছে। কারণ বিজেপি পুজোর অনুদান দেওয়ার তীব্র বিরোধিতা করছে। ফলে কারা পুজোর পক্ষে, আর কারা
পুজো নিয়ে রাজনীতি করছে, সেটা জলের মতো স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।
একথা বলতে দ্বিধা নেই, বাংলার সবকিছুতেই রাজনীতি খোঁজেন নেতারা। বন্যার সময় প্রাণ বাঁচাতে মানুষ আর সাপ একই গাছে আশ্রয় নেয়, কিন্তু রাজনীতির কারবারিরা কখনওই এক হতে পারে
না। পাঁচ ঘণ্টার লাগাতার বৃষ্টিতে বানভাসি হল কলকাতা। বিপর্যস্ত হল জনজীবন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় যখন সকলের এককাট্টা হওয়ার কথা, তখন রাজনৈতিক নেতারা ফায়দা লোটার জন্য একে অপরের দিকে আঙুল তুলে গেলেন। এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে!
যে কোনও ইস্যুকে সামনে রেখে এ রাজ্যে উৎসব বিরোধী একটা হাওয়া তোলার চেষ্টা হয়। উদ্দেশ্য, অশান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি। ২০২২ সালে সল্টলেকে সেই পুজোর কথা মনে আছে? কট্টর হিন্দুত্বপন্থী
একটি সংগঠন দুর্গাপুজোয় অসুর সাজিয়েছিল জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীকে। অসুরের চোখে গান্ধীজির গোল চশমা, আর হাতে লাঠি। অসুরের মাথায় চুল নেই। শুরু হয়ে গেল তুমুল বিতর্ক। ছড়াল উত্তেজনা। পুলিশ গিয়ে অসুরের চশমা খুলে নিল, হাতের লাঠি সরিয়ে ধরিয়ে দিল খাঁড়া। মাথায় লাগিয়ে দিল চুল। পুলিশি তৎপরতায় বানচাল হয়ে যায় অশান্তি পাকানোর চেষ্টা।
পরের বছর চাকরিহারা শিক্ষকদের ধর্নামঞ্চকে ইস্যু করতে চেয়েছিল বিরোধীরা। কিন্তু তাতেও সুবিধে হয়নি। আর গত বছর অভয়ার মর্মান্তিক মৃত্যুকে সামনে রেখে উৎসবের আলো ম্লান করার চেষ্টায় কোনও খামতি ছিল না। কার্নিভালের সময় দেশ বিদেশের পর্যটকদের সামনে বাংলাকে কালিমালিপ্ত করার মরিয়া চেষ্টা চলেছিল। বেশকিছু পুজো কমিটি ‘জাস্টিসে’র দাবিতে সরকারি অনুদান নেয়নি। কিন্তু পরে তারা বুঝেছে, কাজটা ঠিক হয়নি। তাই বেশকিছু পুজো কমিটি অনুদানের টাকা ফের পাওয়ার জন্য মুচলেকা দিয়েছে। অনুদান না পেলে তাদের পুজো বন্ধ হয়ে যাবে, এমনটা নয়। তা সত্ত্বেও তারা মুচলেকা দিয়েছে। উদ্দেশ্য ক্লাবের গা থেকে ‘বিপ্লবী’ তকমা মুছে ফেলা। দেরিতে হলেও তারা বুঝেছে, উৎসবের সঙ্গে রাজনীতিকে জড়ানো ঠিক হয়নি। এই জন্যই বলে, ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।
এবছরও পুজো কমিটিগুলিকে যাতে সরকার অনুদান দিতে না পারে, তার চেষ্টাও হয়েছিল।
কিন্তু আদালত তাতে জল ঢেলে দিয়েছে। পুজোর
খরচ বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানো হচ্ছে সরকারি অনুদান। গত বছরের চেয়ে ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে এবার অনুদান দেওয়া হচ্ছে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা। অনেকে মনে করছেন, ছাব্বিশে বাংলা দখলের ভোট। তাই এক ধাক্কায় ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিজেপির দাবি, হিন্দুভোট পাওয়ার লোভেই এই সিদ্ধান্ত।
একথা ঠিক, রাজনৈতিক দলগুলি বা সরকার যে সমস্ত সিদ্ধান্ত নেয়, তার বেশিরভাগই ভোটের কথা মাথায় রেখে। আর্থিক অনুদানের পাশাপাশি দেওয়া হচ্ছে বিদ্যুৎ বিলের উপর বিপুল ছাড়। মুখ্যমন্ত্রীর এই অনুদানের সিদ্ধান্ত নিষ্কাম, এমনটা ভাবার কারণ নেই। সরকারি অনুদান বাংলার সবচেয়ে বড় উৎসবকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে, একথা স্বীকার করেও বলতে হয়, পুজো কমিটিগুলিকে খুশি রাখাও মুখ্যমন্ত্রীর অন্যতম লক্ষ্য। সরকারি অনুদান পাওয়ায় মহিলা পরিচালিত পুজো কমিটিগুলি বেজায় খুশি। তার প্রভাব ভোট রাজনীতিতে পড়বে। অনেকের মতে, মহিলা পরিচালিত পুজো কমিটিকে আর্থিক অনুদান দেওয়ার প্রভাব লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়।
ভোট রাজনীতিতে পুজোর অনুদান অনেকটা ‘টনিকে’র কাজ করে। সেটা দেরিতে হলেও বিরোধীরা বুঝতে পারছে। বিজেপি শাসিত মহারাষ্ট্র সরকারও গণপতিবাপ্পার পুজোয় ২৫ হাজার টাকা করে অনুদান দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণাতেই কি গণেশ পুজোয় অনুদান দিতে বাধ্য হয়েছে? দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা দুর্গাপুজোয় বিদ্যুৎ বিলের উপর ছাড় ঘোষণা করেছেন। এটা কি নিষ্কাম? মোটেই না। অনুদানের উদ্দেশ্য, দিল্লিতে বসবাসকারী বাঙালিদের কাছে টানা।
অনুদানের মাহাত্ম্য টের পাচ্ছে বিজেপি। তাই
তারা ক্ষমতায় না থাকলেও বাংলায় দুর্গাপুজোর
জন্য কমিটিকে অনুদান দিতে চাইছে। কেন্দ্রের
ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি। টাকার অভাব নেই। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৭৫ বছর উপলক্ষ্যে দেশজুড়ে খেলা, দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। তাই ছাব্বিশের
ভোটের জন্য বাংলায় পুজো কমিটিগুলিকে বিজেপি টাকা দিতে চাইবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু উত্তরবঙ্গের দু’একটি জেলায় বাদ দিলে অন্যত্র বিজেপি তেমন সাড়া পায়নি। কারণ বিজেপির শর্ত, অনুদান নিলে পুজো প্যান্ডেলে টাঙাতে হবে নরেন্দ্র মোদির ছবি। আর তাতেই নাকি কমিটিগুলির অনীহা! অধিকাংশ পুজো কমিটি বিজেপির সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত
করতে চাইছে না। কারণ তারা মনে করছে, ছাব্বিশে বিজেপির পরিস্থিতি একুশের চেয়েও করুণ হবে। তাই অনেকে মোদিজির অনুগামী হয়েও ছবি টাঙানোর ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
নির্বাচন এলে দিল্লির নেতারা এ রাজ্যে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করেন, এটা বাংলার মানুষ জানে। তবে দিল্লির নেতাদেরই নয়, বিজেপির প্যান্ডেলে মা দুর্গার অবির্ভাবও নির্বাচন কেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। পঞ্জিকা মেনে মা দুর্গা বাংলায় আসেন। কিন্তু বিজেপির প্যান্ডেলে দেবীর আসাটা বঙ্গ বিজেপির মর্জির উপর। নির্বাচন থাকলে মা আসার সুযোগ পান। কিন্তু বাংলায় ভোট না থাকলে মায়ের আসা অনিশ্চিত। ২০২৪ সালে নির্বাচন ছিল। তাই ২০২৩ সালে বিজেপি দুর্গাপুজো করেছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে বাংলায় কোনও নির্বাচন না থাকায় গতবছর দুর্গাপুজো করেনি বিজেপি। কিন্তু, এবার পুজো করছে। কারণ ২০২৬ সালে বাংলা দখলের ভোট। তাই এবার এলেও পরের বছর বিজেপির প্যান্ডেলে মায়ের আসাটা ঘোর অনিশ্চিত। ২০২৭ সালে কোনও ভোট নেই।
বিজেপির অবস্থা অনেকটা সারা বছর পড়াশোনা না করে পরীক্ষা দিতে যাওয়া ছাত্রের মতো। পরীক্ষা এলেই মনে পড়ে দেব-দেবীকে স্মরণের কথা। তা না হলে সারা বছর ‘জয় শ্রীরাম’। কিন্তু নির্বাচন এলেই দিল্লির বড় বড় নেতাদের মুখে শোনা যায় দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, মা কালীর নাম। ‘জয় শ্রীরাম’এর আস্ফালন এখন আর শোনা যাচ্ছে না। মুখে শুধুই মা দুর্গা, মা কালী সহ বাঙালিদের প্রিয় দেবদেবী। অনেকে বলছেন, বিজেপির এই ভক্তি ফেল করার ভয়ে, অন্তরের নয়।