Bartaman Logo
২৬ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণকাজ, নেপথ্যে সিন্ডিকেট!

ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণের কারণে ঘটেছে বিপর্যয়, সিন্ডিকেটের জালিয়াতির অভিযোগে তদন্ত চলছে। কলকাতা পুরসভার রিপোর্টে উঠে এসেছে বিস্ফোরক তথ্য। বিস্তারিত পড়ুন।

ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণকাজ, নেপথ্যে সিন্ডিকেট!
  • ২৬ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: নির্মাণেই গলদ। সামগ্রী তো বটেই, সেইসঙ্গে আনুপাতিক মিশ্রণেও। তারাতলা বিপর্যয়ে পুরসভার প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্টে সামনে আসছে এই বিস্ফোরক তথ্যই। সূত্রের খবর, বিল্ডিং প্ল্যানে প্রাথমিকভাবে কোনো খামতি ছিল না ঠিকই। কিন্তু গোলযোগ শুরু হয় তার পর। নিয়ম অনুযায়ী পুরসভাকে স্ট্রাকচারাল ডিজাইন জমা দিতে হয়। সেটা নির্মাণকারী সংস্থা করেনি। পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের আধিকারিকদের নিয়মমাফিক পরিদর্শনের প্রয়োজন ছিল, গাফিলতি ধরা পড়েছে সেখানেও। আর এমন ‘অনিয়ম’ই কেড়ে নিল একের পর এক প্রাণ। পুরসভার রিপোর্টে সাফ বলা হয়েছে, ঢালাইয়ের জন্য নিম্নমানের সিমেন্ট তো ব্যবহার হয়েছেই। পাশাপাশি সিমেন্টের সঙ্গে বালির অনুপাত সঠিক ছিল না। কম সিমেন্ট ব্যবহার করে বেশি বালি দেওয়া হয়েছিল মিশ্রণে। এমনকি, কাঠামোয় যে গুণমানের লোহা ব্যবহার হয়েছে, সেটাও নির্ভরযোগ্য নয়। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিল্ডিং প্ল্যান অনুযায়ী দু’টি বিমের মধ্যে যে নির্দিষ্ট গ্যাপ বা দূরত্ব থাকার কথা, তা রাখা হয়নি। প্রয়োজনের তুলনায় সেই গ্যাপ বেশি থাকায় উপরের কংক্রিট শেডের ভার ধরে রাখতে পারেনি। পাশাপাশি, ঢালাইয়ের পর তা মজবুত হওয়ার জন্য যতটা সময় দেওয়া উচিত, সেটাও দেয়নি নির্মাণকারী সংস্থা। প্রশ্ন উঠছে, এর কারণ কী? নেপথ্যে কারা?

Advertisement

তদন্তে নেমে সিট জানতে পেরেছে, গোটা সমীকরণের পিছনে কাজ করত একটি ‘সিন্ডিকেট’। প্ল্যান পাশ থেকে নির্মাণে খবরদারি। উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব এবং পশ্চিম—কলকাতার প্রত্যেক অংশের জন্য সেই সিন্ডিকেটের একজন মাথা ছিল। কেউ বহুতল বা সাধারণ বাড়ি তৈরির জন্য জমি কিনলেও তার খবর চলে যেত সিন্ডিকেটের কাছে। স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে। হাজির হয়ে যেত তাদের লোকজন। প্রস্তাব দিত, প্ল্যান পাশ থেকে সিসি—সবটাই আমরা বের করে দেব। তার জন্য আলাদা ‘কনসালন্টেন্সি’ চার্জ লাগবে। জমির নথিতে গোলমাল থাকলেও তারা ‘সামলে’ দেবে। সিটের দাবি, জাল নথি তৈরি এবং পুরসভা থেকে তা ‘পাশ’ করানো, জমির রেকর্ড ও চরিত্র বদল, এমন অনিয়ম লাগাতার চালিয়েছে তারা। মাটি পরীক্ষার জন্যও তাদের আলাদা ‘ল্যাব’ থাকত। সেটা অবশ্য নামেই। ওই শতাধিক ল্যাবে কোনো প্রশিক্ষিত কর্মী থাকত না। টাকা পেলেই সিন্ডিকেট ‘পছন্দমতো’ সয়েল টেস্ট রিপোর্ট দিয়ে দিত। মাটির প্রকৃতি কেমন, সেখানে কী ধরনের কাঠামো বানানো যেতে পারে, তার উল্লেখই থাকত না তাতে। অথচ, কোনো ‘জাদুবলে’ তা পুরসভার বেড়াজাল টপকে যেত। সিটের অভিযোগ, রিপোর্ট এমনভাবে দেওয়া হত, যাতে পাঁচ থেকে সাত তলা বিল্ডিং বানানোয় ছাড় মেলে। তারপর আসরে নামতেন সিন্ডিকেটের ‘বেতনভুক’ এলবিএস। কোনো পরীক্ষা ছাড়াই প্ল্যান পাশ, রাস্তার মাপ প্রকৃত রেকর্ডের তুলনায় বাড়িয়ে দেখানো—এই সবই পুরসভার ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে আঁতাত গড়ে ‘রূপদান’ করতেন এলবিএস। সিট দাবি করছে, সিন্ডিকেট পুরো ডিলটাই করত কাঠাপিছু লাখখানেক টাকার অঙ্কে। কাউন্সিলাররাও এই সিন্ডিকেটে যুক্ত।
সেই ইঙ্গিত বৃহস্পতিবার মিলেছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যেও। তিনি বলেছেন, ‘কী ভাবছেন, আপনার কেএমসিতে কি হয়েছে আমরা জানি না? আপনার কালীকে তুললে সব বেরিয়ে যাবে। কলকাতা কর্পোরেশনে কালী না বললে কোনো প্ল্যান হয় না। আর কালী অ্যাপয়েন্টেড বাই ক্যামাক স্ট্রিট—সবাই জানে। এই কালী বাইপাসের পাশে আপনাদের তৃণমূল ভবন বানাচ্ছে ২০০ কোটি দিয়ে।’ রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এখানে ‘আপনার’ বলতে প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের কথাই বুঝিয়েছেন শুভেন্দু। কারণ, কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রাক্তন মেয়রের ওএসডি ছিলেন। নজর করার মতো বিষয় হল, এদিন সন্ধ্যাতেই কালী বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে সিট। তারাতলা কাণ্ডে নির্মাণের ক্ষেত্রে তাঁর ‘প্রভাব’ রয়েছে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে তারা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ