সংবাদদাতা, খড়্গপুর: ‘ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়েছে ওকে। আমাদের ধারণা, খুনই করা হয়েছে!’ খড়্গপুর আইআইটির মেধাবী পড়ুয়ার রহস্য-মৃত্যুর ঘটনায় শুক্রবার এমনই দাবি করলেন পরিবারের সদস্যরা। এদিনই রাজস্থান থেকে তাঁরা খড়্গপুরে এসে পৌঁছান। বৃহস্পতিবার বিকেলে খড়্গপুর আইআইটির মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র অঙ্কিত শর্মার (১৯) অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। বিকেল ৩টে নাগাদ খড়্গপুর আইআইটির নালন্দা কমপ্লেক্সের নীচ থেকে তাঁর রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার হয়। পরে ছাত্রটিকে আইআইটির বি সি রায় হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক ‘মৃত’ বলে ঘোষণা করেন। ঘটনার পরই নালন্দা কমপ্লেক্সের ঘটনাস্থলে যান খড়্গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বুশারা বানোর নেতৃত্বে খড়্গপুর টাউন আধিকারিকরা। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, নিছকই দুর্ঘটনা, নাকি আত্মহত্যা না খুন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শুক্রবার অঙ্কিতের মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয় মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। বিকেল ৩টে নাগাদ সেখানে পৌঁছান অঙ্কিতের জেঠু বাবরলাল শর্মা ও খুড়তুতো দাদা জয়প্রকাশ শর্মা।
অঙ্কিতের জেঠু ও দাদা দুজনই এদিন দাবি করেছেন, অঙ্কিত আত্মহত্যা করার মতো ছেলে নয়। দুপুর আড়াইটাতেও সে বাবার কাছে পাঁচ হাজার টাকা চেয়ে ফোন করেছিল। বিকেল ৩টে থেকে তার ক্লাস ছিল। আর সেইসময়ই এই ঘটনা ঘটে।
ছেলের মৃত্যুর খরব পাওয়ার পর থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন পেশায় কৃষক পরমেশ্বরলাল শর্মা। পরমেশ্বরবাবুর দাদা বাবরলাল শর্মা অসমে থাকেন। সেখানে তাঁর মিষ্টির দোকান। এদিন তিনি বলেন, অঙ্কিতরা দুই ভাই—ও ছোটো। ওর দাদা মাদ্রাজ আইআইটির পড়ুয়া। দুজনই মেধাবী ও মিশুকে।
তিনি এও বলেন, ‘পুলিশ ও আইআইটি কর্তৃপক্ষের তরফে আমাদেরকে নালন্দা কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনতলায় ওদের ক্লাস হয়। সেখানে যে জায়গা থেকে অঙ্কিত ‘পড়ে গিয়েছিল’ বলে দাবি করা হচ্ছে, সেই জায়গাটা চার ফুট রেলিং দিয়ে ঘেরা আছে। পড়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আর রেলিংয়ে বসে আড্ডা দেওয়াটাও অসম্ভব। আমাদের ধারণা, ওই জায়গা থেকেই ওকে ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়েছে।’
ওই জায়গায় কোনো সিসিটিভি না-থাকায় ক্ষুব্ধ বাবরলালবাবু। তিনি বলেন, ‘ওই সময়ে ওদের ক্লাস ছিল। অন্য পড়ুয়াদেরও থাকার কথা। কেউই কিছু জানল না! আর সিসিটিভি ফুটেজও কিছু নেই। আমরা তাই খুনের অভিযোগ দায়ের করছি।’
খড়্গপুর আইআইটির ডিরেক্টর সুমন চক্রবর্তী বলেন, ‘খুবই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিল। প্রথম সেমেস্টারের তুলনায় দ্বিতীয় সেমেস্টারে ওর রেজাল্টও ভালো হয়েছিল। দুর্ঘটনা বলেই মনে হচ্ছে। তবে, পুলিশ তদন্ত করছে। আমরা এফআইআর করেছি। একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিমও গড়েছি।’
উল্লেখ্য, গত ২০ মাসে এই নিয়ে আইআইটি খড়্গপুরের ১০ জন পড়ুয়ার অস্বাভাবিক মৃত্যু হল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আত্মহত্যার তত্ত্বে সিলমোহর দিয়েছে পুলিশ। খড়্গপুর আইআইটির মেধাবী পড়ুয়াদের আত্মহননের কারণ খুঁজতে গিয়ে, মানসিক চাপের সঙ্গেই উঠে আসছে মাদক (ড্রাগ) ব্যবহারের বিষয়টিও। গত তিনদিন আগেই খড়্গপুর আইআইটি ক্যাম্পাস থেকে লক্ষ্মণ সাহা নামে এক অস্থায়ী কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। খড়্গপুর টাউন থানার পুলিশ তাকে ধরেছে ক্যাম্পাসে ড্রাগ পাচারের অভিযোগে। মেদিনীপুরের এক মনোবিদ বলেন, ড্রাগের নেশায় বুঁদ হয়ে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার ঘটনা প্রায়ই শোনা যায়। ঠিক তেমনই নেশাগ্রস্ত হয়ে অপরকে খুন করাটাও অস্বাভাবিক নয়!