নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ১৭ নভেম্বর, ২০২২। ভারতে ওষুধ শিল্পমহলের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন। কারণ, সেদিনই জাল ওষুধ রুখতে ৩০০টি জরুরি ওষুধে ‘কিউআর কোড’ বা ‘বার কোড’ ব্যবস্থা চালু করার গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় সরকার। তাতে এও লেখা ছিল, ‘বার কোড’ বা ‘কিউআর কোড’ স্ক্যান করলেই সেই ওষুধ সংক্রান্ত আট ধরনের তথ্য বেরিয়ে আসবে। সরকারি এই নির্দেশ কার্যকর হওয়ার পর অনেকেরই মনে হয়েছিল, এবার নকল ওষুধের হাত থেকে মুক্তি! কিন্তু সেই ব্যবস্থা যে কতটা ঠুনকো, এবার রাজ্য ড্রাগ কন্ট্রোলের বাজেয়াপ্ত করা জাল ওষুধের নমুনা থেকেই স্পষ্ট! কারণ, ওষুধের মতো তার অ্যালুমিনিয়াম প্যাকেজিং বা ব্লিস্টারে কিংবা বাইরের প্যাকেজিংয়ে বসানো ‘কিউআর কোড’ নকল হয়ে যাচ্ছে নিমেষে।
ড্রাগ কন্ট্রোল সূত্রের খবর, রীতিমতো ‘হাইটেক’ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে ভেজাল ওষুধের কারবারীরা। হরিয়ানার সোনেপতে ভেজাল ওষুধের প্যাকেজিং কারখানায় আটক করা যন্ত্রপাতি দেখে তেমনটাই মনে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক মিনিটেরও কম সময়ে নকল করা সম্ভব ওষুধে থাকা ‘কিউআর কোড’। শুধু তাই নয়, সেই কোড স্ক্যান করলে আসল ওষুধের মতো কোম্পানির ওয়েবসাইট থেকে আটটি তথ্য বেরিয়ে আসছে। ফলে ওষুধটি আসল না জাল বোঝাই হয়ে পড়ছে অসম্ভব!
কিন্তু কীভাবে সম্ভব হচ্ছে এই কারবার? যে ৩০০টি ওষুধে ‘কিউআর’ লাগানোর নির্দেশ জারি করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার, সেগুলির আসল প্যাকেট থেকে ‘কিউআর কোড’ স্ক্যান করে লিঙ্ক কপি করে নিচ্ছে কারবারীরা। তারপর ইন্টারনেটে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা শয়ে শয়ে কিউআর কোড জেনারেটর সংস্থার ওয়েবসাইটে গিয়ে সেই লিঙ্ক থেকে তৈরি করা হচ্ছে নতুন কোড। সেই কোড ছাপিয়ে বাজারে ছাড়া হচ্ছে জাল ওষুধ। কেউ কেউ তো আবার এত ঝামেলায় না গিয়ে, আসল ওষুধের ‘কিউআর কোড’ই স্ক্যান করে ছাপিয়ে দিচ্ছে নকলের প্যাকেটে।
ওষুধ নির্মাতাদের অবশ্য দাবি, ভেজাল কারবারীদের জব্দ করবার ফর্মুলা তাঁরা বের করে ফেলেছেন। আসল ওষুধের প্রতিটি স্ট্রিপে আছে আলাদা ‘কিউআর কোড’। জাল ওষুধে তেমনটা হয় না। একটিই কোডই সবেতে বসানো থাকে। একই কোড আলাদা আলাদা ডিভাইস থেকে তিন থেকে পাঁচবারের বেশি স্ক্যান করলেই তা ‘লক’ হয়ে যাবে। সফ্টওয়্যার মারফত নির্মাতারাও খবর পেয়ে যাবেন, কোন আইপি অ্যাড্রেস থেকে বারবার ‘কিউআর কোড’ স্ক্যান করা হচ্ছে। তাদের দাবি, এইরকম বেশ কিছু সন্দেহজনক স্ক্যানের তথ্যই ড্রাগ কন্ট্রোলকে দেওয়ায় এত ধরপাকড় সম্ভব হচ্ছে। যদিও ওষুধ জাল হওয়া ঠেকানোর বিশেষজ্ঞ ডঃ অভি চৌধুরী সাফ জানাচ্ছেন, এই ‘লক’ করার ব্যবস্থা দেশের এত ওষুধ নির্মাতার মধ্যে ক’জন চালু করেছে জানেন? মাত্র তিনটে সংস্থা। কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে, অথচ ওষুধের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে চার আনাও খরচ করতে চায় না! তার ফল ভুগছেন ক্রেতারা।