


মেহেবুব হোসেন সরকার, তপন: ধানের শিষে ভরা মাঠ। তার ভিতর দিয়ে সরু মাটির পথ। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়বে উঁচু ফটক। তার ভিতরে দাঁড়িয়ে এক প্রাচীন অট্টালিকা। সেটি মনোহলির জমিদারবাড়ি। আজ একেবারে ভগ্নপ্রায়। দেওয়ালের রং চটেছে। ছাদের কড়ি বরগা নড়বড় করছে। বাড়িটি বহন করছে বহু গল্প। বহু হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের সুগন্ধও। এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে প্রায় দুই শতাব্দীর দুর্গাপুজোর ইতিহাস। এবং তা হস্তান্তরের গল্প।
১৮৩৫ সালে তারাচাঁদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে কাছারিবাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা। তাঁর পুত্র যোগেশচন্দ্র ১৮৯০ সালে জমিদারবাড়ি নির্মাণ শেষ হলে জাঁকজমক করে দুর্গোৎসব শুরু করেন। পুজোকে কেন্দ্র করে গ্রামজুড়ে উৎসবের আমেজ ছড়াত তখন। চারদিন ধরে ঢাক বাজত। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত যাত্রাপালা, নাটক, মঙ্গলগান জমজমাট থাকত গ্রাম। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়ে গেলেও ১৯৫১ সাল পর্যন্ত এই পরিবার পুজো চালিয়ে যায়। কিন্তু অর্থ ও লোকবলের সঙ্কটের কারণে ১৯৫৪ সালে দায়িত্বে অব্যাহতি দেয়। তারপর বারোয়ারির চেহারা নেয় দুর্গোৎসব। তখন থেকে গ্রামবাসীরা চাঁদা তুলে পুজো করতে থাকেন। জমিদার পরিবার থেকে যায় শরিক হিসেবে। তবে মূল দায়িত্ব গ্রামবাসীর কাঁধেই ন্যস্ত থাকে। প্রথমে জমিদারবাড়ির ভিতর দুর্গামণ্ডপে পুজো হতো। কিন্তু দুর্গামণ্ডপ জীর্ণ হতে থাকায় নিরাপত্তার কারণে বাড়ির সামনে তৈরি হয় নতুন দুর্গামণ্ডপ। এখন সেই নতুন মন্দিরেই প্রতিবছর দুর্গাপুজো হচ্ছে। আয়োজক পরেশ বর্মন বলেন, ‘এই পুজো আমাদের গর্ব। জমিদাররা না থাকলেও আমরা চাঁদা তুলে ও সকলে মিলে আয়োজন করি। আমাদের কাছে এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, গ্রামবাসীদের মিলনমেলা।’ জমিদারদের বর্তমান প্রজন্মের প্রতিনিধি রণধীর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘জমিদারি উঠে যাওয়ার পর আমাদের পক্ষে এককভাবে এই উৎসব চালানো সম্ভব হয়নি। তাই গ্রামবাসীর হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয়। আমাদের পরিবার আজও এই পুজোর সঙ্গে আবেগের বন্ধনে যুক্ত। নবমীর অঞ্জলি আমরা নতুন মন্দিরেই দিয়ে থাকি।’
বর্তমানে মনোহলির দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় আচার নয়, সামাজিক উৎসবেরও প্রতীক। একসময় গোটা এলাকা এই পুজোর জন্য মুখর হয়ে থাকত। প্রতিটি বাড়িতে রান্না বন্ধ থাকত। কারণ প্রতিদিনই ভোগের আয়োজন থাকত জমিদারবাড়িতে। বর্তমানে তা হয় না। কিন্তু গ্রামবাসীদের ঐক্য ও অংশগ্রহণে দুর্গাপুজো এখনও প্রাণবন্ত আছে। আজ ধ্বংসস্তূপের মতো দাঁড়িয়ে থাকা জমিদারবাড়ি গৌরব হারিয়েছে। কিন্তু তার ছায়াতেই টিঁকে মনোহলির দুর্গাপুজো। জমিদারদের হাত থেকে গ্রামবাসীদের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তরের এই ইতিহাস শুধু একটি গ্রামের কাহিনি নয়। তা জমিদারি প্রথার অবসানের পর গ্রামীণ ঐতিহ্যের নতুন রূপ পাওয়ারও দলিল।-নিজস্ব চিত্র