নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বিজেপি সরকার গঠন হলে বাংলায় ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’ সংস্কৃতি চালু হবে। ভোট প্রচারে বঙ্গবাসীকে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রাক নির্বাচনি সভায় মোদির মুখে তৃণমূল জমানার তোলাবাজি-সিন্ডিকেটরাজের প্রসঙ্গ বারবার উঠে এসেছে। তারপর রাজ্যে পালাবদল হয়েছে। আগামী ৯ আগস্ট শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের বয়স তিনমাস পূর্ণ হতে চলেছে। কিন্তু তোলাবাজি চলছেই। তা বন্ধ করা যায়নি। শনিবার প্রকাশ্যেই একথা কার্যত স্বীকার করে নিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য স্বয়ং। রাজারহাটে আইআইটি খড়্গপুর রিসার্চ পার্কে ‘উদ্যমী সমাগম’ অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে তিনি বলেন, ‘দু’মাস হয়েছে একটা সরকার তৈরি হয়েছে। সমস্ত কিছুর সমাধান করা যায়নি। আমি আমার দলের পক্ষ থেকে যদি বলি সব জায়গায় তোলাবাজি বন্ধ করে দিতে পেরেছি, তাহলে ভুল হবে। কিছু বিচ্যুতি আছে। একটা পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে মানুষ দীর্ঘদিন গিয়েছে। ইজি মানির মধ্যে দিয়ে একটা সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পরে সমস্ত কিছু বদল হয়ে গিয়েছে, এমনটা নয়। কেউ কেউ চার ঘণ্টার মধ্যে শাসকদলে যোগ দিয়েছেন। আমার দলেরই অনেকের মধ্যে সুপ্ত বাসনা, যা এতদিন অতৃপ্ত অবস্থায় ছিল, সেগুলি ফুটে বেরচ্ছে। তাঁরাও কারও কারও সঙ্গে যোগ দিয়েছে। এটা অস্বীকার করলে মিথ্যাচার হবে। আমরা চেষ্টা করছি দলের পক্ষ থেকে তা নিয়ন্ত্রণ করার।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বঙ্গ বিজেপি সভাপতির এই কাতর আর্তনাদ প্রমাণ করল যে সরকার বদলালেও তোলাবাজির ‘অসুখ’ সারাতে ব্যর্থ গেরুয়া পার্টি। ভোটে জেতার পর থেকে ভিন দলের নেতা-কর্মীদের পদ্ম শিবিরে যোগদানের প্রবণতা সুনামির মতো বাড়ছে। শমীকবাবু মুখে সংশ্লিষ্ট অংশের জন্য দলের ‘দরজায় খিল’ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। অথচ তৃণমূলের ২০ জন এমপি ‘জার্সি বদলে’ সংসদে শাসক বিজেপির জোট এনডিএ’র শরিক হয়ে গিয়েছেন। আবার ঋতব্রত শিবিরে যোগ দিয়েছেন ৬০ জন জোড়াফুল বিধায়ক। বিধানসভায় তাঁরা শাসক শিবিরকেই যোগ্য সংগত করছেন বলে অভিযোগ কালীঘাট তৃণমূলের সদস্য কুণাল ঘোষের। তৃণমূলত্যাগী এহেন প্রাক্তন মন্ত্রী-শীর্ষ নেতারা রাতারাতি ‘ভালো’ তকমা পেয়ে যাওয়ায় নীচুতলার জোড়াফুল কর্মী-সমর্থকরা বাড়তি উৎসাহ পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরাই এখন স্থানীয়ভাবে বিজেপির নিয়ন্ত্রক। সেকথাও এদিন উঠে এসেছে শমীকবাবুর বক্তব্যে। তাই সাবধানবাণী শুনিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ‘অনেকেই বিজেপিতে আসছে। তাঁরা যদি মনে করে, আমরা ২০৭ (বিধায়ক সংখ্যা) এই শরীরীভাষা নিয়ে ময়দানে নামবে, তাহলে পরিণতি অত্যন্ত বিপজ্জনক হবে। কারণ, ডিম থেরাপি যে-কোনো দিন অভিমুখ বদল করবে। তাই সতর্ক হোন।’ বাংলা রাজনীতিসর্বস্ব চিরাচরিত পরিমণ্ডল থেকে বেরতে না পারলে কোনো সরকার কিছু করতে পারবে না বলেও আক্ষেপের সুর শোনা যায় তাঁর গলায়। বিজেপির এই রাজ্যসভার এমপি ভাষণের শেষ লগ্নে বলেন, ‘পরের বছর এই সমাবেশ যখন হবে আমাকে ডাকবেন না। আমি সরকারের কেউ নই। দলীয় রাজনীতিকে এই ব্যবস্থার বাইরে রাখতে হবে। আমি লক্ষ্য করছি, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিনিয়োগকারীরা আমায় তাঁদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। এই প্রবণতা অত্যন্ত বিপজ্জনক।’ নাম না করে বাম ও তৃণমূল জমানার দলীয় কায়েমি স্বার্থের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।