


সংবাদদাতা, নবদ্বীপ: আশঙ্কাই যেন সত্যি হল। জমল না নবদ্বীপ ও মায়াপুরের রথ উৎসব। বেশ কয়েক দশক পর বাংলার এই দুই অন্যতম বৈষ্ণব তীর্থে প্রত্যাশা অনুযায়ী ভিড় হল না। কার্যত হতাশ ভাগীরথীর দু’পারের সাধারণ ব্যবসায়ী থেকে হোটেল মালিকরা। কারণ হিসেবে সকলেই একবাক্যে মানছেন, দীঘার জগন্নাথ মন্দির ও রথ উৎসবই এবার নবদ্বীপ-মায়াপুরের ভিড় কমিয়ে দিয়েছে। অনেক প্রবীণ ব্যবসায়ী আক্ষেপের সঙ্গে জানিয়েছেন, শেষ কবে এমন ‘হতশ্রী’ ভিড় দেখেছেন, তা মনে করতে পারছেন না। একমাত্র করোনাকালে বিধিনিষেধ থাকায় ভিড় ছিল না। তবে, দীঘায় জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধনের পর রথে ভিড় খানিকটা কম হবে বলে আঁচ করেছিল সব মহলই। ব্যবসায়ীদের এহেন মন খারাপকে সঙ্গী করে শুক্রবার নবদ্বীপ ও মায়াপুরে নির্বিঘ্নেই রথ উৎসব পালিত হয়। দাদা বলরাম, বোন সুভদ্রাকে নিয়ে মাসির বাড়ি চললেন প্রভু জগন্নাথদেব। দুপুরে নাম-সংকীর্তন সহকারে মায়াপুরের রাজাপুর থেকে ইসকনের রথ বের হয়। প্রথা মেনে নারকেল ভেঙে, ঝাড়ু দিয়ে এই রথের সূচনা করেন বাংলা চলচ্চিত্র জগতের দুই নায়িকা দেবশ্রী রায় ও রুক্মিণী এবং সাংসদ জগন্নাথ সরকার। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে রথ ইসকনের চন্দ্রোদয় মন্দিরে এসে পৌঁছয়। উপস্থিত ছিলেন জেলাশাসক এস অরুণ প্রসাদ, জেলা পরিষদের সভাধিপতি তারান্নুম সুলতানা। রাতভর বৃষ্টির পর শুক্রবার ভোরে উজ্জ্বল রোদ ওঠে। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে নবদ্বীপ ও মায়াপুরের মঠ-মন্দির কর্তৃপক্ষ আশা করেছিলেন, বৃষ্টিহীন আবহাওয়ায় বেশ ভালোই ভক্ত সমাগম হবে। কিন্তু, বেলা যত বেড়েছে, সবারই নিরাশার পাল্লা ভারী হয়েছে। বিকেলের দিকে মাঝেমধ্যে বৃষ্টি হয়। নবদ্বীপের রথ উৎসবেও লোকজন তেমন নেই। একই ছবি মায়াপুরেও। দুই তীর্থস্থানে স্থানীয় মানুষজনই বেশি ভিড় করেছিলেন বলে জানা গিয়েছে। বিগত বছরগুলিতে মায়াপুরে কৃষ্ণভক্ত বিদেশিরা নজর কাড়তেন। এবার তাঁদের সংখ্যাটাও অনেকটাই কম ছিল। তাঁদের একটা বড় অংশ দীঘায় চলে গিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। অন্যান্য বছরে দুই মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম থেকে নবদ্বীপ ধামে ভক্তের ঢল নামত। ওই তিন জেলার ভক্তরা এবার দীঘার রথযাত্রা নিয়ে মাতোয়ারা ছিলেন বলেই মত ব্যবসায়ীদের।
মায়াপুর হুলোর ঘাটে হোটেল ব্যবসায়ী মধুসূদন শিকদার বলেন, অন্যবারের চেয়ে এবার মায়াপুরে খুব কম সংখ্যক ভক্ত এসেছেন। প্রায় সকলেই দীঘার রথ উৎসবে গিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। আমার হোটেলে মোট ৪২টি রুম হয়েছে। বিগত বছরগুলিতে একটি রুমও খালি থাকত না। এবার মাত্র ১০টি রুমের বুকিং হয়েছে। ইসকনের সামনে পুজোর সামগ্রীর দোকান রয়েছে অরূপ দাসের। তিনি বলেন, দীঘায় জগন্নাথদেবের নতুন মন্দির এবার মায়াপুরের ভিড় টেনেছে। বাঙালিদের একটা বড় অংশ, যাঁরা প্রতি বছর এখানকার রথযাত্রা উৎসবে আসতেন, তাঁরা দীঘায় গিয়েছেন।
চৈতন্যভূমি নবদ্বীপেও প্রায় একই অবস্থা। রথ উপলক্ষ্যে এখানকার একাধিক মঠ-মন্দিরের সামনে ছোটখাটো মেলা বসে। এবারে মেলায় স্থানীয় লোকজন ছাড়া বাইরের ভক্তদের সেভাবে দেখা যায়নি। স্বাভাবিকভাবেই বিক্রিবাটা কম। মন খারাপ ব্যবসায়ীদের। উল্টোরথেও এই ছবির খুব একটা হেরফের হবে না বলেই তাঁদের ধারণা।
আগামী ৫ জুলাই, শনিবার পর্যন্ত জগন্নাথদেব এসে থাকবেন ইসকন মায়াপুরের পঞ্চতত্ত্ব মন্দিরের অস্থায়ী গুণ্ডিচা মন্দিরে। এটাই জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি। ইসকনের জনসংযোগ অধিকারিক রসিক গৌরাঙ্গ দাস বলেন, উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে রথযাত্রা উৎসব পালিত হচ্ছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই রথের রশিতে টান দিয়েছেন। এদিন নবদ্বীপেও ধুমধামের সঙ্গে রথযাত্রা উৎসব পালিত হয়।