


ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ‘অসদাচরণ’ প্রমাণ করতে দেশের প্রায় সব বিরোধী দল লোকসভা ও রাজ্যসভায় ‘ইমপিচমেন্ট’ প্রস্তাব এনেছিল মার্চ মাসে। মোট সাত দফা অভিযোগের অন্যতম ছিল, বিহারে এসআইআর-এ বহু মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সেই মডেল গোটা দেশে প্রয়োগ করা হচ্ছে। তাছাড়া তিনি কেন্দ্রের শাসকের অঙ্গুলিহেলনে কাজ করছেন বলেও অভিযোগ। সংসদে দুই কক্ষের ১৯৩ জন সাংসদ এই প্রস্তাবে সই করেছিলেন। যদিও লোকসভার স্পিকার ও রাজ্যসভার চেয়ারম্যান উভয়েই সেই প্রস্তাব খারিজ করে দেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর নিয়ে কমিশনের বিরুদ্ধে মামলায় বিশেষ ক্ষমতাবলে একের পর এক নির্দেশ জারি করে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট বুঝিয়ে দিয়েছে, যা খুশি তাই করা যায় না। রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বৈধ ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ করে দিতে সর্বোচ্চ আদালতের এবারের পদক্ষেপ শুধু বিরলই নয়, নজিরবিহীনও। ইতিহাস বলছে, অতীতেও নির্বাচন কমিশনের কাজে বা নিষ্ক্রিয়তায় সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের ১৪২তম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। সেসব ছিল কমিশনের গঠন কিংবা অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা সংক্রান্ত মামলার রায়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর করতে গিয়ে কমিশনের প্রক্রিয়াগত ব্যর্থতায় লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম বাদ যাওয়া আটকাতে ১৪২ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করেছে শীর্ষ আদালত। ‘সম্পূর্ণ ন্যায়’ নিশ্চিত করতে আদালতকে যেকোনো নির্দেশ জারির সম্পূর্ণ ক্ষমতা দিয়েছে দেশের সংবিধান। ফলে সংসদে ‘ইমপিচমেন্টের’ হাত থেকে শাসকগোষ্ঠী সংখ্যাধিক্যের জোরে রক্ষা করলেও সর্বোচ্চ আদালতে রেহাই পেলেন না জ্ঞানেশ কুমার। এর পরে নৈতিক দায় কি তিনি মেনে নেবেন?
নির্বাচন কমিশনের তুঘলকি আচরণে বাংলায় শুরু থেকেই এসআইআর নিয়ে চরম ও চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গই একমাত্র রাজ্য, যেখানে ‘তথ্যগত অসঙ্গতি’র নামে ৬০ লক্ষ ভোটারকে ‘বিচারাধীন’ করে রাখা হয়। বলা যায়, এখান থেকেই যাবতীয় বিরোধ-বিতর্কের সূত্রপাত। যার পরিণতিতে একাধিক মামলা হয় শীর্ষ আদালতে। কমিশন ব্যর্থ হওয়ায় এই বিপুল সংখ্যক ‘বিচারাধীন’ নামের নিষ্পত্তি করতে প্রথমে ‘বিচারক’ নিয়োগের নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে এটা আদালতের প্রথম পদক্ষেপ। প্রায় মাসাধিককাল ধরে এই পর্ব চলার পর ‘বিচারাধীন’ ৬০ লক্ষের মধ্যে ২৭ লক্ষকে ‘অবৈধ’ বলে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এই তালিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠায় ‘বৈধ-অবৈধের’ চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতিদের দিয়ে ট্রাইবুনাল গঠিত হয়। এবার প্রশ্ন ওঠে, রাজ্যে ৬ ও ৯ এপ্রিল ভোটার তালিকা চূড়ান্ত (ফ্রিজ) হয়ে যাওয়ার পর ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দু’ দফা নির্বাচনের আগে ট্রাইবুনাল ‘ডিলিটেডদের’ মধ্যে যাঁদের ‘বৈধ’ হিসাবে স্বীকৃতি দেবে, তাঁরা এবার ভোট দিতে পারবেন কি না। সুপ্রিম কোর্ট এবার সেই ১৪২ অনুচ্ছেদ মেনে বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে জানিয়ে দিয়েছে, ২৩ এপ্রিল ভোটের জন্য ২১ এপ্রিল এবং ২৯ এপ্রিল ভোটের জন্য ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত ট্রাইবুনাল যাঁদের ‘বৈধ’ বলে স্বীকৃতি দেবে— তাঁরা ভোট দিতে পারবেন। এ জন্য নির্বাচন কমিশনকে অতিরিক্ত সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রকাশ করতে হবে।
প্রত্যাশিতভাবেই সুপ্রিম কোর্টের এই নয়া নির্দেশে তৃণমূল সুপ্রিমোসহ রাজ্যের বিজেপি বিরোধী দলগুলি খুশি। সুবিচারের পীঠস্থান সর্বোচ্চ আদালতের বারংবার হস্তক্ষেপ, নির্দেশ ও বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তোলা শাসক তৃণমূল ও বিজেপি বিরোধীদের গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলি আদৌ অসার নয়। বাংলার ভোটে বিজেপিকে সুবিধা করে দিতে নির্বাচন কমিশন, বিশেষত জ্ঞানেশ কুমার নিরলস, নিবিড় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে— আদালতের নির্দেশে কোথাও যেন তাতেই মান্যতা খুঁজে পাচ্ছে বঙ্গবাসী। তবে এই বিশেষ নির্দেশের পর ঠিক কত সংখ্যক ‘ডিলিটেড’ ভোটার শেষ পর্যন্ত ‘বৈধ’ বিবেচিত হয়ে ভোট দিতে পারবেন—তা স্পষ্ট হতে সময় লাগবে। কারণ ট্রাইবুনালের বিবেচনার জন্য ইতিমধ্যে ৩৪ লক্ষের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। রাজ্যের ২৩টি জেলার জন্য ট্রাইবুনালের সংখ্যা ১৯টি। প্রথম দফার ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্রের সংশোধিত তালিকা চূড়ান্ত হবে ২১ এপ্রিল। মানে হাতে পাঁচ দিন সময়। দ্বিতীয় দফার ১৪২টি আসনের জন্য সংশোধিত তালিকা চূড়ান্ত হবে ২৭ এপ্রিল। হাতে এগারো দিনের মতো সময়। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে কত জনের আবেদনের নিষ্পত্তি করে ফেলা যাবে, এবং তাতে ইতিমধ্যে প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকার বিশেষ কোনো হেরফের ঘটা সম্ভব কি না— সেই আশঙ্কাও রয়েছে আবেদনকারী অনেকের মধ্যে। তবে এটাও ঠিক, এই সুযোগটা সামনে আসায় অনেকেই আশার আলো দেখছেন। তর্কের খাতিরে এটাকে ‘প্রতীকী’ ধরে নিলেও বলা যায়, নির্বাচন কমিশনের কাজে যে শীর্ষ আদালতকে বারবার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হল, এটা নজিরবিহীন ছাড়াও একইসঙ্গে কমিশনের পক্ষে লজ্জারও। আদালতে বারবার ধাক্কা খেতে হচ্ছে কমিশনকে। কমিশনের কর্তারা যদি এর থেকে সামান্য লজ্জিত ও সংযত হন, তাহলে তা গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ।