নিজস্ব প্রতিনিধি, আরামবাগ: খানাকুলের সেনহাটে মিত্রবাড়ির দুর্গা আরাধনায় সন্ধি পুজো এখনও থমকে আছে জল ঘড়িতে। কয়েকশো বছরের প্রাচীন এই রীতি পুজোর আভিজাত্য বাড়িয়েছে। তাছাড়াও আরও নানা রীতিতে দেবী দুর্গার আরাধনায় মাতেন এক সময়ের জমিদার মিত্রবাড়ির সদস্যরা। অষ্টমীতে সিঁদুর খেলা থেকে দশমীতে অকাল রথ। এমনও চল রয়েছে ওই বাড়ির পুজোয়।
মিত্রবাড়িতে কার্যত দুর্গাপুজো শুরু হয়ে জন্মাষ্টমী থেকেই। ওইদিনই সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরের পিছন থেকে মাটি নিয়ে এসে দুর্গার কাঠামোয় লেপা হয়। তারপর নিয়ম মাফিক সদর পুকুর থেকে মাটি দিয়ে গড়ে ওঠেন মা দুর্গা। সাবেকি মূর্তি বছরের পর বছর একই কাঠামোতেও গড়া হচ্ছে। মিত্রবাড়ির সদস্যরা কর্মসূত্রে দেশ ও বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন। পুজোর সময় তাঁদের প্রত্যেকের গন্তব্য সেনহাট।
মিত্র বাড়ির সদস্যরা জানিয়েছেন, ষষ্ঠীতে নিয়ম মাফিক দেবীর বোধন হয়। তাঁদের কূল দেবতা রঘুনাথ জিউ আসেন দুর্গা দালানে। দেবীর সঙ্গে নিত্যদিন তিনিও পূজিত হন। দেবীকে সাজানো হয় নানা অলংকারে। তারসঙ্গে সপ্তমীতে বাড়ির বধূরা লক্ষ্মী পাতেন। মিত্রবাড়িতে অষ্টমীর সন্ধিপুজোর রীতি এখনওএকই। সূর্যোদয়ের সময় থেকে দেখা হয় জল ঘড়ি। বহু বছর ধরে প্রহর গুনে সন্ধিপুজো হয় মন্দিরে। সেইসময় ফাটানো গাছ বোমা। তার শব্দে পার্শবর্তী এলাকার দুর্গাপুজোতেও সন্ধিপুজো শুরু হয়।
বাড়ির সদস্য চিকিৎসক সুকন্যা মিত্র বলেন, পূর্বপুরুষদের তৈরি করা নিয়ম মেনে এখনও আমাদের বাড়ির পুজো হয়ে আসছে। আয়োজনে কোনো ত্রুটি রাখা হয় না। অষ্টমীর সন্ধিপুজো আমাদের কাছে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রথা। জলঘড়ি দেখার রীতি যেমন রয়েছে, একইসঙ্গে ওইদিনই বাড়ির বধূরা দেবীর সিঁথিতে সিঁদুর পরান। অষ্টমীতেই মহিলারা সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন। এমনকি, দেবীর স্পর্শের সিঁদুর রেখেও দেওয়া হয় বছরভর।
অষ্টমীর পাশাপাশি নবমীতেও ছাগবলির প্রথা রয়েছে এখানে। এছাড়া চালকুমড়ো বলিও হয়ে আসছে। বলি পান সিদ্ধেশ্বরী কালীও। এছাড়া ধুনো পোড়া, কুমারী পুজোর রীতিও রয়েছে।
বাড়ির আরেক সদস্য সূর্যায়ন মিত্র জানান, নবমীর সন্ধ্যায় আরতির পর পরিবারের সদস্যরা মিলে শারদীয়া জলসার আয়োজনও করি। তাতে গান, আবৃত্তি, অঙ্কন প্রভৃতি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবী আরাধনাই করা হয়।
তবে দশমী এলেই মন ভারাক্রান্ত হয়ে যায় প্রত্যেকের। কিন্তু সেদিনও মিত্রবাড়িতে নানা রীতিতে দেবীকে বিদায় জানানো হয়। কূল দেবতাকে নিয়ে রথে দাঁড়ান পুরোহিত। সেই রথের চারপাশ পরিক্রমা করেন মহিলারা। তারপর রথের রশি টেনে নিয়ে যাওয়া রঘুনাথ জিউয়ের মন্দিরে। আতসবাজি প্রদর্শনের সঙ্গে গভীর রাতে সদর পুকুরেই দেবী মূর্তির নিরঞ্জন হয় মিত্রবাড়িতে।



