


তামিম ইসলাম, ডোমকল: শরীরে বার্ধক্য এসেছে। কুঁচকে গিয়েছে গায়ের চামড়া। কিন্তু, তারপরেও বাপ-দাদুর আমল থেকেই নববর্ষের ভোরবেলায় দুধ ফুটিয়ে উথলে ফেলে দেওয়ার প্রথাটা আজও জিইয়ে রেখেছেন রানিনগরের শ্যামলী দাস। এতদিনেও বদল ঘটেনি সেই অভ্যাসের। এখনো ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, স্নান সেরে পুজো দেওয়া, তারপর দুধ ফুটিয়ে কিছুটা উথলে ফেলে দেওয়া-সবটাই আগের মতো করে চলেছেন শ্যামলীদেবী। শুধু শ্যামলীদেবীই নন, জলঙ্গি, রানিনগর, সাগরপাড়ার চর এলাকার অনেকের কাছেই নববর্ষ মানেই মনে আসে ওপার বাংলার ফেলে আসা স্মৃতি। ভিটেমাটি ছেড়ে এপারে এসে বহু বছর কেটে গেলেও বছরের এই একটা দিন এলেই পুরানো দিনের কথা ফিরে আসে তাঁদের মনে। তাই অনেকেই এখনো সেই পুরনো প্রথা মেনেই দিনটা কাটান।
জানা গিয়েছে, ষাট-সত্তরের দশকে ওপার বাংলা থেকে বহু পরিবার এপারে এসে বসত গড়েছিল। কেউ আবার পরে ফিরে গিয়েছেন, কেউ থেকে গিয়েছেন এই বাংলাতেই। এখন তাঁদের পরিবার এই দেশেই প্রতিষ্ঠিত। নতুন প্রজন্ম অনেকটাই বদলে গেলেও বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠদের মনে এখনো গেঁথে রয়েছে ওপার বাংলার সেই জীবনযাপন। এখনো তাঁদের আত্মীয়দের অনেকেই থাকেন ওপারেই। তাই নববর্ষের দিনে পুরনো দিনের স্মৃতি, আত্মীয়স্বজন, ইলিশ-পান্তা, সবই মনে পড়ে তাঁদের। এরকমভাবে ষাটের দশকে বাপ-কাকার হাত ধরে বাংলাদেশ ছেড়ে এদেশে এসেছিলেন রানিনগরের শ্যামলী দাস। তখন বাড়ি ছিল রাজশাহি। বয়স ছিল ১৮-এর নীচে। আর এখন বয়স ৮৫-ছুঁইছুঁই। তবু নববর্ষের দিনের সেই স্মৃতি আজও স্পষ্ট তাঁর মনে। শ্যামলীদেবী বলছিলেন, তখন ভোরবেলা উঠে আমরা সবাই স্নান করতাম। মায়েরা লাল পাড় শাড়ি পরে পুজো করতেন। গোরুদের স্নান করিয়ে কপালে সিঁদুর দিতাম। গোয়ালঘর পরিষ্কার করে আলপনা আঁকতাম। ওইদিন গোরুকে ভালো খাবার খাওয়ানো হত। দুধ দুইয়ে তা জ্বাল দেওয়া হত। সেই দুধ উথলে ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করত মায়েরা lমায়েরা বলত, দুধ যত বেশি উথলে উঠবে, বাড়ির গোরুর দুধের পরিমাণ বাড়বে। সেই দুধে সারা বছর আমরা দুধে-ভাতে থাকতে পারব। মা-দিদিমারা এখন আর বেঁচে নেই। এদেশে থাকলেও এখনো প্রতিবছর নববর্ষের দিনে দুধ ফুটিয়ে কিছুটা দুধ উথলে ফেলে দিই আমি। আজকের দিনে খুব ছোটোবেলার কথা মনে পড়ে।
সাগরপাড়ার কল্পনা মণ্ডল বলেন, আমাদের বাড়ি ছিল কুষ্টিয়ায়। নববর্ষের সময় বাড়িতে নাম করা দোকানের মিষ্টি পাঠাত আত্মীয়রা। খুব ভোরে স্নান, নতুন জামা, মিষ্টিমুখ সব মিলিয়ে পয়লা বৈশাখে অন্যরকম একটা আনন্দ ছিল। এখন আর সেভাবে হয় না, কিন্তু দিনটা এলেই সেইসব কথা মনে পড়ে।
সবমিলিয়ে সময় বদলেছে, জায়গা বদলেছে। তবু নববর্ষ এলেই এই মানুষগুলির জীবনে একদিনের জন্য ফিরে আসে ওপার বাংলার সেই পুরনো দিন।