


বিশেষ নিবন্ধ, কলহার মুখোপাধ্যায়: হাসপাতালের সেই করিডরটা কে না দেখেছে? স্ট্রেচারে শুয়ে বাচ্চা মেয়েটি, থ্যালাসেমিয়ার রোগী, মা বারবার ফোন করছেন এখানে ওখানে, ‘ও নেগেটিভ কেউ আছেন?’
কিংবা অপারেশন থিয়েটারের বাইরেটা? চিকিৎসক বলছেন, ‘রক্ত না পেলে অস্ত্রোপচার কিছুতেই শুরু করা যাবে না।’ সারা শহর ঘুরে ঘামে চুপচুপে জামা গায়ে বাবা দাঁড়িয়ে, রক্ত জোগাড় করতে পারেননি, কাঁদছেন।
এক ব্যাগ বা এক ইউনিট রক্তের মূল্য কেউ বুঝুক না বুঝুক সাধারণ মানুষ ভালোই বোঝেন। এইটুকু রক্ত মানে—একটা থেমে যাওয়া অপারেশন আবার শুরু হল। একটা শিশু বেঁচে ওঠার শক্তি পেল। একটা পরিবার ভেঙে যেতে যেতেও ঘুরে দাঁড়াল। একটা জীবন নতুন করে হাঁটা শুরু করল আবার। এক ব্যাগ রক্ত মানে কেবল কিছু লাল তরল নয়—তা কারও সন্তানের হাসি। কারও মায়ের জীবন।
এই সব দৃশ্য আলাদা আলাদা কোনো গল্প বলে এমন না। এগুলো একসঙ্গে মিলে তৈরি করে দেশের রক্তসংকটের রূঢ় সত্যি কথা। যে বাস্তব মারাত্মক কিছু সংখ্যা হয়ে উঠে আসে সবার সামনে। সে সংখ্যা ধারালো, নির্মম, চাবুকের মতো জানায়, ভারতে বছরে প্রায় ১.৫ কোটি ইউনিট রক্তের প্রয়োজন হয়। অথচ সংগ্রহ হয় ১.৩ কোটির মতো। অর্থাৎ প্রতি বছরই ২০ লক্ষ ইউনিট রক্ত প্রয়োজনের তুলনায় কম পাওয়া যায়। পশ্চিমবঙ্গে দরকার লাগে প্রায় ১২ লক্ষ ইউনিট রক্ত। কিন্তু পাওয়া যায় ৯ লক্ষ ইউনিটের মতো। এই না পাওয়ার সংখ্যা থেকে যায় শূন্য হয়ে। জীবনের খাতায় সে রক্ত যোগ হয় না।
এ সংকট গ্রীষ্মে আরও বাড়ে।
কারণ, গরমের ছুটিতে স্কুল-কলেজ থাকে বন্ধ। ক্যাম্প হয় কম। অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকে। বা জ্বর বা অসুস্থতার কারণে সিরিয়াস রক্তদাতারাও দান করা থেকে বিরত থাকেন। ফলে এপ্রিল থেকে জুন, বছরের এই সময়কাল হয়ে ওঠে সবচেয়ে সংকটপূর্ণ। যে গরমকালে ভোট হয় সে বছর অবস্থা আরও সঙ্গিন। ভিভিআইপিদের আনাগোনা বাড়ে। নেতাদের জন্য ইউনিট মজুত রাখতে হয় প্রশাসনকে। তারপর সে রক্ত কাজে না লাগলে ফেলে দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি বড়ো অংশকে নির্বাচনের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। সম্প্রতি এই সংবাদপত্রেই প্রকাশিত হয়েছে, রাজ্যের সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাংকের প্রায় ৮০ শতাংশ কর্মীকে বিধানসভা ভোটের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া এ সময় কোনো রাজনৈতিক দল ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্পের আয়োজনও করতে পারে না।
এক ইউনিট রক্ত মানে ৩৫০ থেকে ৪৫০ মিলিলিটার। এই সামান্য পরিমাণই মানুষের জীবন-মৃত্যুর ফারাক গড়ে
দেয়। দুর্ঘটনায় আহত, প্রসূতি, অস্ত্রোপচারের সময়, থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত বা ক্যানসারের রোগীর কাছে এইটুকু রক্ত বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়। সেটুকুও ঠিকঠাক মেলে না। ব্লাড ব্যাংকের তাকগুলি খালি পড়ে থাকে। রক্তের
অভাবে পিছিয়ে যায় অপারেশন। আটকে যায় জরুরি চিকিৎসা। প্রিয়জনকে বাঁচাতে যে কোনো মূল্যে রক্ত কিনতে মরিয়া হয়ে ওঠে মানুষ। টাকা দিয়ে রক্ত কেনার প্রবণতা বাড়ে। সে ফাঁক দিয়ে বেআইনি কেনাবেচা বৃদ্ধি পায়। এবং মাথা তোলে অস্বচ্ছ বাজার।
সরকারি নীতিতে রক্ত বিক্রি নিষিদ্ধ। তবে আইনের
ফাঁক আছে। প্রসেসিং চার্জের নামে এক বা দু’হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় প্রতি ইউনিটে।
অনেক ক্ষেত্রেই বেসরকারি ব্লাড ব্যাংকে এই খরচ
আরও বেশি।
ফলে অভাব যখন বাড়ে তখন কালোবাজারি মাথা তোলে। দরিদ্র রোগীর পরিবারকে ঘটিবাটি বিক্রি করে হলেও চড়া দাম দিয়ে কিনতে হয় জীবনদায়ী রক্ত।
গরম পড়লে রাস্তায় যেমন ধুলো ওড়ে, তেমনভাবেই নিঃশব্দে উড়ে যায় অনেক মানুষের বাঁচার শেষ আশাটুকুও। রক্তের অভাব—কথাটা কাগজে-কলমে যতটা ছোটো, বাস্তবে তার যন্ত্রণা ততটাই গভীর, ততটাই অসহনীয়।
হাসপাতালের করিডরে বসে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যায়, এই সংকট কেবল চিকিৎসার নয়—এটি আতঙ্কের আর অপ্রাপ্তির অসহায়তারও। সারাজীবন সংসার সামলানো বৃদ্ধ আজ অসুস্থ, হাসপাতালে ভর্তি। অপারেশনের আগে দরকার দু’ইউনিট রক্ত। ছেলেমেয়েরা ছুটছেন, ফোন করছে, সর্বত্রই শুনতে হচ্ছে, ‘নেই’। এই ‘নেই’য়ের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে আত্মসম্মান। একের পর এক পরিবার খরচ জোগাতে গিয়ে আরও দরিদ্র হয়ে পড়ছে। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ছোটো বাচ্চাটির শরীরে মাসে মাসে রক্ত না ঢুকলে সে বাঁচবে না। তার কাছে রক্ত প্রয়োজনেরও অতিরিক্ত, প্রতিদিনের বেঁচে থাকা। এরই মধ্যে গুটিগুটি পায়ে গ্রীষ্ম আসে, দাবদাহ বাড়ে, আর নিঃশব্দে থাবা বসায় অদৃশ্য সংকট। হাসপাতালের করিডরে কেবল ওষুধ আর যন্ত্রপাতির শব্দ নয়, অসহায় অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাসও প্রকটভাবে কানে আসে। এ সংকট কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নির্মম বাস্তব। সংকটের গল্প শুরুর উৎস কি?
কারণ অসংখ্য। তারমধ্যে অন্যতম প্রধান, যত পরিমাণ রক্ত সংগ্রহ হয় তার সবটা ব্যবহারযোগ্য থাকে না। রক্তের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ আছে। ‘হোল ব্লাড’ ৩৫ থেকে ৪২ দিন। প্লেটেড ব্লাড ৫ দিন। সংগ্রহ করা রক্তের একটি অংশ সময়মতো ব্যবহার না হওয়ায় যায় নষ্ট হয়ে। এভাবে দেশে প্রতিবছর আনুমানিক ৫ থেকে ১০% রক্ত নষ্ট হয় বলে বিভিন্ন স্বাস্থ্য রিপোর্টে উল্লেখ মেলে। এছাড়াও আছে কারণ। সেগুলি হল, সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় কম থাকা। নির্দিষ্ট কিছু গ্রুপের সংকট সর্বদা তীব্র। অন্যদিকে সাধারণ কিছু গ্রুপের রক্ত অতিরিক্ত জমা হওয়া। এছাড়া আছে সামাজিক দিক। রক্তদান এখনও অনেকের কাছে ভয়ের বিষয়। রক্ত দিলে শরীর দুর্বল হবে এমন ভ্রান্ত ধারণা বহুল প্রচলিত। অন্যদিকে স্বেচ্ছায় রক্তদানের বদলে রিপ্লেসমেন্ট ডোনেশন ব্যবস্থার প্রচলন। রোগীর প্রয়োজনে পরিবারের কাউকে রক্ত দিতে হয়। সে রক্তের বদলে নিজের গ্রুপের রক্ত পান রোগী। কেনাবেচা নিষিদ্ধ বলে বহু মানুষ এই রিপ্লেসমেন্ট ডোনেশনের উপরই নির্ভরশীল। দেশে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ রক্ত এই পদ্ধতিতেই আসে। পশ্চিমবঙ্গে এই হার আরও বেশি, প্রায় ২৫ শতাংশ। গ্রীষ্মকালে যখন স্বেচ্ছায় রক্তদান কমে তখন এই নির্ভরতা আরও বাড়ে। ফলে কম চাহিদার গ্রুপের রক্ত যায় জমে। এবং পড়ে থেকে নষ্ট হয়। এছাড়াও আছে কারণ। গ্রুপ অনুযায়ী চাহিদা ও জোগানের অমিল। সংরক্ষণের সমস্যা। বা সংগ্রহ করা রক্তে সংক্রমণ ধরা পড়ার কারণেও বাতিল হয়। এছাড়াও আছে কাঠামোগত সমস্যা। নিয়মিত দাতার অভাব। সচেতনতার ঘাটতি। গ্রামীণ ব্লাড ব্যাংকে সংরক্ষণ ও পরিবহণের ঠিকঠাক ব্যবস্থা না থাকা। সংগ্রহের তথ্য ঠিকমতো না রাখা। অধিকাংশ ব্লাড ব্যাংকের তথ্য রিয়েল টাইমে আপডেট হয় না ফলে কোথায় রক্ত মজুত রয়েছে তা জানা হয়ে পড়ে কঠিন।
কিন্তু দুর্ঘটনা তো থামে না। অপারেশন তো থেমে থাকে না। থ্যালাসেমিয়ার বাচ্চাটার প্রতি মাসের চাহিদাও কমে না। ভাবা যাক এ অবস্থায় কী করতে পারি আমি-আপনি।
রক্তসংকট কমানোর লড়াই শুধু রোগের বিরুদ্ধে নয়, মানুষের উদাসীনতার বিরুদ্ধেও। রক্তদান শুধু একটি চিকিৎসা সহায়তা নয়। একজন অচেনা মানুষ তার শরীরের অল্প কিছুটা দিয়ে অন্য এক অচেনার জীবন বাঁচাচ্ছেন, এর থেকে বড়ো মানবিকতা আর কিছুই হতে পারে না। প্রশ্নটা তাই কেবল রক্তের ঘাটতির নয়, প্রশ্নটা মানবিকতারও। আমরা কি শুধুই বিপদের সময় দায়িত্ববোধ অনুভব করব, মানে কারও দরকার হলে তবেই রক্ত দেব? নাকি সচেতন নাগরিক হিসেবে নিয়মিত রক্তদানের অভ্যাস গড়ে তুলব? একটি রক্তদান কারও জীবনে হাসি ফিরিয়ে দিতে পারে, বাঁচিয়ে দিতে পারে কোনো পরিবার।
জেনে রাখা উচিত, একজন সুস্থ মানুষ নিরাপদে বছরে ৩-৪ বার রক্ত দিতে পারেন। তাতে শরীরের ক্ষতি হয় না, উলটে অনেকক্ষেত্রে নিজের স্বাস্থ্যপরীক্ষা হয়ে যায়। কিন্তু বহু মানুষ ভাবেন, ‘অন্য কেউ তো দেবে, আমার না দিলেও চলবে।’ এই ভাবনাই কারও জীবনের শেষপ্রহর ডেকে আনে। গ্রীষ্মকালীন এই সংকট শুধু মৌসুমি সমস্যা নয়, সবমিলিয়ে এটি দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতার প্রতিফলন। পশ্চিমবঙ্গে এই সংকট আরও প্রকট কারণ, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও সরকারি ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা এখানে বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই সংকট মোকাবিলায় বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন, সারাবছর রক্তদান। বিশেষ দিনগুলি শুধু নয়, নিয়মিত রক্তদানের অভ্যাস তৈরি করতে হবে। এপ্রিল থেকে জুন, বিশেষ রক্তদান শিবিরের আয়োজন করা দরকার। অফিস, আই টি সেক্টর, কারখানায় রক্তদান শিবিরের সংখ্যা বৃদ্ধি। সোশ্যাল মিডিয়া ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভ্রান্ত ধারণাগুলি ক্রমাগত দূর করতে থাকা। মোবাইল অ্যাপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দাতা ও গ্রহীতার সংযোগ স্থাপনের প্রক্রিয়া চালানো। গ্রাম ও শহরতলিতে ব্লাড স্টোরেজ বৃদ্ধি এবং দ্রুত যাওয়া আসার জন্য পরিবহণের ব্যবস্থা রাখা।
রক্তের অভাব মানে শুধু চিকিৎসার সংকট নয়, এটি আমাদের সমাজের সংবেদনশীলতার পরীক্ষাও। এই পরীক্ষায় আমরা কতটা উত্তীর্ণ হতে পারছি, সেটা ভাবার সময় দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে।
হয়তো আমরা সবাই কোনো না কোনোদিন সেই হাসপাতালের করিডরে দাঁড়াতে পারি—অসহায়, উদ্বিগ্ন। তখন যদি কোনো অচেনা হাত এগিয়ে আসে, সেটাই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে বড়ো আশ্বাস। তাই প্রশ্নটা খুব সহজ, আমরা কি কারও সেই অচেনা হাতটা হয়ে উঠতে পারি?