নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: কোহলি গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে রোহিতও প্যাভেলিয়নে। শহরজুড়ে কেমন যেন আচমকা নীরবতা। তবুও হাল ছাড়ার প্রশ্নই ওঠে না। কারণ একা রোহিতই খানিক্ষণ আগে টেনে নিয়ে গিয়েছেন ইনিংস। এখন বাকিদের পালা। পার্ক সার্কাস মোড়ে মোবাইল ছেড়ে এবার উঠে দাঁড়ালেন সাহিল। ফোনটা দিয়ে দিলেন অসীমকে। দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এবার ফ্ল্যাগটা আনার ব্যবস্থা করতে হবে।’ একজন পিছন থেকে বললেন, ‘আর একটু ওয়েট করে যা।’ তবে প্রবল আপত্তি উঠল। বক্তব্য, ‘রোহিত যা টেনে দিয়েছে, ধরে নে আমরা ম্যাচ জিতে গিয়েছি।’ বলেই উদযাপন কেমন হবে সে দিকে চলে গেল আলোচনা। সময় এগল। উদযাপনও হল ভালোরকম। জয়ের পূর্বাভাস সন্ধ্যায় হার্ট বিট বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ের আনন্দেই মিশল। ছুটির দিন, রবিবার বারুইপুর থেকে বারাকপুর, গড়িয়া থেকে পার্ক সার্কাস, হাতিবাগান থেকে বরানগর, সল্টলেক থেকে নিউটাউন মেতে ক্রিকেট উদযাপনের আনন্দে।
ফুটপাতে বসে কেউ একা একাই ফোনে চোখ রেখেছেন। মাঝে মধ্যে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত ঝাঁকিয়ে নিচ্ছেন। কেউ পাঁচ আঙুল বুলিয়ে নিচ্ছেন মাথায়। দেখেই বোঝা যাচ্ছে মন খেলার দিকে। পথচলতিরা জিজ্ঞেস করে নিচ্ছেন, ‘দাদা, স্কোর কত?’ এমন দিনে এরকম প্রশ্নে শহরবাসী রাগ করে না। বরং ফোনটি সহ নাগরিকের দিকে এগিয়ে দেয়। এদিন বিভিন্ন পাড়ার মোড় থেকে ধর্মতলার রাজপথ, দুপুর দু’টোর আগেই মোটামুটি শুনশান। পাড়ার দোকানগুলিতে সকাল থেকে কোল্ড ড্রিংক, স্ন্যাক্স কেনার ভিড়। একইরকম জমজমাট বিজয়গড় বাজার। সুদর্শনা সরকার নামে এক ক্রেতা বললেন, ‘আজ ছেলের বন্ধুরা এসে খেলা দেখবে। তাই একটু কেনাকাটা করছি।’ ছুটির বিকেলে যাঁরা নিউ মার্কেটে সময় কাটাতে এসেছিলেন, তাঁদের হাতেও মুঠোফোন। খেলা দেখে নেওয়ার ঝোঁক সর্বক্ষণ। দোকান হোক কিংবা পাড়ার মোড়ের ক্লাব, জায়ান্ট স্ক্রিন হোক কিংবা ছোট টিভি, চোখে পড়লেই পথচলতিরা দাঁড়িয়ে পড়ছেন। ধর্মতলায় ফোনে চোখ রেখে বসিরহাটের স্বরূপ সাহা বললেন, ‘একটা বাস ছেড়ে দিলাম ভিড় আছে বলে। ফাঁকা পেলে বসে খেলা দেখতে দেখতে যাব। কাজে যেতে দেরি হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু দেশ তো আবেগ।’ সল্টলেকের দত্তাবাদ এলাকায় শিবাঙ্গন মন্দিরে মহাযজ্ঞের আয়োজন-ইন্ডিয়াকে জেতাতে হবে।
এই আবেগ এতটাই বড় যে, কোনও রাজনৈতিক-নাগরিক মিছিলকেও যেন হার মানায়। এদিনই বিকেলে ধর্মতলা থেকে নাগরিক মিছিল বের হয়েছিল। সেখানে যোগ দিতে আসা কয়েকজনের বক্তব্য, ‘মিছিলের জন্য আজকের দিনটাই বাছতে হল?’ ‘তিলোত্তমার ভয় নাই...’ বলতে বলতে কেউ বলে উঠলেন, ‘স্কোরটা কত ভাই?’ বড়রা চোখ রাঙালে ছোটদের যুক্তি, ‘ক্রিকেটের সঙ্গে আন্দোলনের বিরোধ নেই।’ এদিন সমস্ত বিরোধ ভুলে, দূরে রেখে যাদবপুরের রাস্তা দিয়ে ‘ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া’, বলে তেরঙা পতাকা নিয়ে দৌড়লেন কেউ। দূর থেকে এল বাজি ফাটার শব্দ। উত্তরে ব্যান্ড পার্টি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে অনেকে। রবিবার সব স্লোগান মিলেমিশে গিয়ে হয়ে উঠল-‘ইন্ডিয়া! ইন্ডিয়া!’ রাতে জাজেদার চারে জয় আসার পর বাজির রোশনাইয়ে যেন অকাল কালীপুজো শহরে। -পিটিআই ও নিজস্ব চিত্র