Bartaman Logo
২৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

আছড়ে পড়ল লিফট, ছেলের চিকিৎসায় এসে মৃত্যু বাবার, আর জি করে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, বিক্ষোভ পরিজনদের

চার বছরের ছেলের ভাঙা হাতের অপারেশন। পাঁচতলার অপারেশন থিয়েটারে ডাকছেন চিকিৎসকরা।  দু’নম্বর লিফটে উঠলেন বাবা, মা এবং কোলে থাকা ছেলে।

আছড়ে পড়ল লিফট, ছেলের চিকিৎসায় এসে মৃত্যু বাবার, আর জি করে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, বিক্ষোভ পরিজনদের
  • ২১ মার্চ, ২০২৬ ০৮:০৩
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: চার বছরের ছেলের ভাঙা হাতের অপারেশন। পাঁচতলার অপারেশন থিয়েটারে ডাকছেন চিকিৎসকরা।  দু’নম্বর লিফটে উঠলেন বাবা, মা এবং কোলে থাকা ছেলে। ‘চার’ সুইচ টিপতে লিফটটি চারতলায় উঠল না। বরং সজোরে আছড়ে পড়ল নীচে, বেসমেন্টে। সেখানেই আটকে থাকল ১ ঘণ্টার বেশি। প্রাণান্তকর চিৎকার-কান্নাকাটি করলেন তিনজন। অক্সিজেন কমে আসছিল। হঠাৎ লিফটটি খুলল। পরিবারকে বাঁচানোর অন্তিম চেষ্টায় বাবা শরীর বের করে ছেলে আর স্ত্রীকে কোনোক্রমে বার করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু অর্ধেক বেরিয়ে থাকা অবস্থাতেই লিফটটি উপরে উঠতে শুরু করল। তারপর বারবার উপর-নীচ করতে থাকল। অভিশপ্ত লিফটের বাইরের দেওয়ালে ঘষতে থাকল শরীর। এমনই ভয়ংকর ঘটনার জেরে মর্মান্তিক মৃত্যু হল এক যুবকের। তাঁর নাম অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় (৪০)। শুক্রবার ভোরে ঘটনাটি ঘটেছে আর জি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চূড়ান্ত গাফিলতির অভিযোগ তুলে হাসপাতাল চত্বরে বিক্ষোভ দেখান বাড়ির লোকজন। 

Advertisement

যুবকের বাড়ি কালিন্দীর জ’পুর এলাকায়। ছেলের হাত ভেঙে যাওয়ায় তাকে ও স্ত্রী সোনালিকে নিয়ে বৃহস্পতিবার রাতে হাসপাতালে যান। সেদিনই ছিল তাঁর জন্মদিন। এক ডাকে সবার বিপদে ছুটে যাওয়া মানুষটি বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মেতেছিলেন। কেউ কল্পনাতেও আনতে পারেননি, পরদিন এমন ঘটনা ঘটে যাবে! পরিবারের অভিযোগ, লিফট থেকে কান্নাকাটি শুনে লোকজন ছুটে আসেন। লিফট খোলার জন্য নিরাপত্তাকর্মীদের কাতর অনুরোধ করতে থাকেন। কেউ কর্ণপাত করেনি। শেষে যখন খোলা হয়, দেখা যায়, রক্তে ভাসছেন অরূপবাবু। স্ত্রী এবং শিশুপুত্রও চোট পেয়েছেন। অরূপবাবুকে ট্রমা ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অরূপবাবুর মৃত্যুর কারণ পলিট্রমা (একাধিক চোট আঘাত)। তাঁর হাত, পা, বুকের পাঁজর থেকে লিভার, ফুসফুস, হার্ট সবেরই ক্ষতবিক্ষত অবস্থা। বোন অর্পিতা, কাকা প্রবীর বন্দ্যোপাধ্যায় সহ বাড়ির লোকজন বলেন, ‘কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত  গাফিলতিতেই মৃত্যু হয়েছে অরূপের। লিফটের বাইরে অন্য একটি গেটের চাবি চেয়েও মেলেনি। বারবার পুলিশ ও দমকল ডাকতে বলেছিলাম। কিন্তু হেডফোন চাপিয়ে গান শুনছিল নিরাপত্তাকর্মী।’
বেলায় রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান তথা স্থানীয় বিধায়ক অতীন ঘোষ হাসপাতালে আসেন। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের চূড়ান্ত গাফিলতি রয়েছে। সোমবারই বৈঠক ডেকেছি। তদন্ত হবে।’ পুলিশ জানিয়েছে, তিনজন লিফটম্যান ও দু’জন বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী সহ পাঁচ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা রুজু হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত গোয়েন্দা প্রধান রূপেশ কুমার জানিয়েছেন, এই মামলার তদন্তভার টালা থানার থেকে গোয়েন্দা বিভাগের হোমিসাইড শাখার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। নাইট ডিউটিতে কারা ছিলেন, কোন এজেন্সি লিফট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল, সব দেখা হচ্ছে। 
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ছুটে আসেন হাসপাতালের উপাধ্যক্ষ ডাঃ সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্যায় সহ স্বাস্থ্যকর্তারা। তাঁদের সঙ্গে পুলিশ ও পূর্তদপ্তরের অফিসারদের বৈঠক হয়। তবে লিফট নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভের কথা শুনিয়েছেন অন্যান্য রোগীর পরিজনও। ট্রমা সেন্টারের ইমার্জেন্সির পাশে বসেছিলেন শিল্পা ভৌমিক। পথ দুর্ঘটনায় আহত স্বামীর চিকিৎসা চলছে। তিনি বললেন, ‘কোনোদিন লিফটম্যানের দেখা পাই না। সবাই তো লিফট চালাতে জানে না।’ ভাঙড়ের আকবর শেখ বলেন, ‘লিফটে বসার টুল দেখতে পাই। লিফটম্যানকে কোনোদিন দেখিনি।’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ