নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝাড়গ্ৰাম: ঝাড়গ্রামে হাতির হানায় মৃত্যু অব্যাহত। সোমবার রাতে লোধাশুলি রেঞ্জের বাসিন্দা এক বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। মৃতার নাম লক্ষ্মী রানা(৬৫)। বাড়ি ঘৃতখাম গ্ৰামে। এনিয়ে গত দু’সপ্তাহে হাতির হানায় তিনজন প্রাণ হারালেন। জামবনীর গিধনী রেঞ্জে হাতির আবাসস্থল গড়ে তুলতে ২ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। হাতির হানায় বারবার মৃত্যুতে সেই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে এবার প্রশ্ন উঠেছে।
দক্ষিণবঙ্গের পাঁচটি ছোট-ছোট জায়গায় হাতির আবাসস্থল গড়ে তোলা হচ্ছে। জামবনীর গিধনী রেঞ্জ তার মধ্যে অন্যতম। এই এলাকায় ১৮০হেক্টর জায়গায় শালগাছের চারা ও শস্যজাতীয় গাছ, ১০হেক্টর জায়গায় ঘাসের বীজ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৬টি পুকুর খনন করা হয়ে গিয়েছে। মাটি ও জল সংরক্ষণের জন্যে ২৮০হেক্টর এলাকায় পরিখা খনন করা হয়েছে। এছাড়া ৬০কিলোমিটার ফেন্সিং করা হবে বলে জানানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও হাতির হানায় মৃত্যুতে মানুষের সংঘাত রোধে এই উদ্যোগের কার্যকরিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠা শুরু হয়েছে। হাতির পালকে বেলপাহাড়ী, জামবনীর জঙ্গল এলাকার দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। উল্টে জঙ্গল লাগোয়া গ্ৰামে হাতির পালের হানা বেড়ে গিয়েছে। হাতির সামনে পড়ে নিরীহ বহু মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
লোধাশুলি এলাকার ঘৃতখাম গ্ৰামের বাসিন্দা প্রবীর রানা বলেন, দিদার বয়স হয়েছিল। গরমে রাতেরবেলা ঘর থেকে বের হয়ে উঠানে বের হয়েছিল। হাতিটি আচমকা এসে আক্রমণ করে। রাতেই দিদাকে হাসপাতাল নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। গ্ৰামের চারপাশে খাবারের সন্ধানে হাতির পাল ঘুরে বেড়ায়। হাতি আক্রমণ করলে থামানোর কোনো উপায় নেই।
ময়ূরঝর্ণা এলিফ্যান্ট রিজার্ভ প্রজেক্টের মতোই নতুন প্রকল্পের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বাম আমলে ২০০২সাল নাগাদ ময়ূরঝরনা এলিফ্যান্ট রিজার্ভ নিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল। রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসায় ২০১৬নাগাদ ময়ূরঝরনা প্রকল্পের জন্য নয় ওয়াল্ড লাইফ বা ডিভিশন গঠনের বিজ্ঞপ্তি জারি করে। তবে তারপর উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ অবশ্য নিতে দেখা যায়নি। সংসদে ২০২২সালে বিষয়টি নতুন করে উত্থাপন করা হয়। কেন্দ্রের মন্ত্রক থেকে রাজ্যের বনবিভাগের বন্যপ্রাণ শাখার কাছে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাওয়া হয়। ময়ূরঝরনা এলিফ্যান্ট রিজার্ভ চালু রয়েছে বলে জানানো হয়েছিল। অথচ বাস্তবে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম মেদিনীপুরের যে অংশজুড়ে ময়ূরঝরনার এলাকায় হাতি থাকে না। বনবিভাগের উদ্যোগে ২০২৪ সালের শেষদিকে জামবনীর গিধনী রেঞ্জ এলাকায় হাতির নতুন আবাসস্থল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঝাড়খণ্ড সীমানায় জঙ্গল ও পাহাড়ী এলাকা রয়েছে। জেলায় হাতির পাল মূলত কৃষিজমির দিকে ঘুরে বেড়ায়। হাতির হানায় একের পর এক মৃত্যু ময়ূরঝরনার পর জামবনী এলাকার হাতির আবাসস্থলের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
জঙ্গলমহল স্বরাজ মোর্চার কেন্দ্রীয় সভাপতি অশোক মাহাত বলেন, জেলায় হাতির হানায় একের পর এক নিরীহ মানুষ মারা যাচ্ছেন। নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বাস্তবে তার সাফল্য চোখে পড়ছে না। সমস্যা সমাধানে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা দরকার। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। লোকদেখানো পরিকল্পনায় মানুষের মৃত্যু থামবে না। বনবিভাগের আধিকারিকরা হাতির হানায় একের পর এক মৃত্যু নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন। ডিএফও ওমর ইমামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও ধরেননি। মেসেজেরও জবাব দেননি।