অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: দু’দিকে শাল-পিয়ালের জঙ্গল। পাখির ডাকের সঙ্গে মিশে যায় ধামসা-মাদলের আওয়াজ। গ্রামের মহিলা-পুরুষ, প্রায় সকলেই কোনো না কোনো ভাবে বাঁশের শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। আউশগ্রামের যাদবগঞ্জ গ্রামের এটাই দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। এবার সেই বাঁশের শিল্পেই যুক্ত হয়েছে নতুন সংযোজন খড়খটো ও ঠাপ নামে দু’টি বাদ্যযন্ত্র। ধামসা-মাদলের সঙ্গে এই দুই যন্ত্রের সুরে চদর-বদর পুতুলনাচে আসছে নতুন মাত্রা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অনুষ্ঠান করে আয়ও বাড়ছে শিল্পীদের।
আউশগ্রাম-১ ব্লকের দিগনগর-২ পঞ্চায়েতের যাদবগঞ্জ গ্রামে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের বাস। গ্রামের মাহালি পাড়ার মহিলারা দীর্ঘদিন ধরেই বাঁশ দিয়ে নানা গৃহস্থালির সামগ্রী তৈরি করেন। ওড়িশা, পুরুলিয়া, বোলপুর থেকে দিল্লি, কলকাতার বিভিন্ন হস্তশিল্প মেলায় ঘুরে ঘুরে সেই সব সামগ্রী বিক্রি করেন তাঁরা। এবার বাঁশের তৈরি বাদ্যযন্ত্রও তাঁদের শিল্পের পরিসর বাড়িয়েছে।
শিল্পীরা জানান, ঝাড়খণ্ড, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও মেদিনীপুরের বিভিন্ন এলাকার লোকবাদ্যযন্ত্র দেখে অনুপ্রাণিত হয়েই তাঁরা এই দুই যন্ত্র তৈরি করেছেন। প্রায় দু’ফুট লম্বা ফাঁপা বাঁশ কেটে তৈরি হয় খড়খটো। বাঁশের গায়ে কয়েকটি বড়ো ছিদ্র থাকে। মোটা ছোটো লাঠি দিয়ে বাঁশের গায়ে ঘষে বা টেনে নানা ছন্দের শব্দ তৈরি করা হয়। বাদনা পরব, চৈত্রের গাজন কিংবা চদর-বদর পুতুলনাচ অনুষ্ঠান অনুযায়ী বদলে যায় সেই সুরের তাল। অন্য যন্ত্রটির নাম ঠাপ। কাঠের ছোট পাটার দু’দিকে দড়ি বাঁধা থাকে। পাটার নীচে লাগানো থাকে ছোট দু’টি কাঠের টুকরো। ছন্দের সঙ্গে দড়িতে টান দিয়ে বাজানো হয় যন্ত্রটি। ধামসা-মাদলের সঙ্গে এই দুই যন্ত্রের আওয়াজ মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে অন্য রকম সুর।
শিল্পী সোম সোরেন, মঙ্গল মুর্মু ও সুনিরাম সোরেন বলেন, আমরা বাঁশ দিয়ে নানা গৃহস্থালির জিনিস তৈরি করি। বাঁশের গায়ে লাঠি দিয়ে আঘাত করলে যে ছন্দ তৈরি হয়, তা ধামসা-মাদলের সঙ্গে বাজিয়ে দেখেছি। বেশ ভাল সুর তৈরি হচ্ছে। আমরা চাই, আমাদের ঐতিহ্য বেঁচে থাকুক। পুতুলনাচের সঙ্গে এই বাদ্যযন্ত্র যুক্ত হওয়ায় বাড়তি আয়ও হচ্ছে।
সম্প্রতি আউশগ্রামের বননবগ্রাম বাউল আশ্রমে অনুষ্ঠানের ডাক পেয়েছিলেন যাদবগঞ্জের শিল্পীরা। সেখানে তাঁদের বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুগ্ধ হন আমেরিকার প্রবাসী সঙ্গীতশিল্পী মহিতোষ তালুকদার সহ অনেকে। যাদবগঞ্জের বাসিন্দা পেশায় শিক্ষক উৎপল বেসরা বলেন, গত দশ বছর ধরে এই ধরনের বাঁশের বাদ্যযন্ত্র দেখছি। শিল্পীরা নিজেদের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।



