


নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল: সোমবার ইসিএলের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হল কর্পোরেট জয়েন্ট কনসুলটেটিভ কমিটি (জেসিসি)-এর বৈঠক। সাঁকতোড়িয়ায় আয়োজিত সর্বোচ্চ কমিটির এই বৈঠকে উঠে এল কেন্দ্রীয় সংস্থা ইসিএলের আর্থিক বিপর্যয়ের ভয়ঙ্কর ছবি। বেড়েছে লোকসানের বহর। যার দরুণ হারিয়েছে শ্রমিকদের এক সঙ্গে বেতন দেওয়ার ক্ষমতা। টেনেটুনে অর্ধেক বেতন দেওয়া হবে ১২ ডিসেম্বর। বাকি অর্ধেক মেটানো হবে চলতি মাসের ২২ তারিখ। সংস্থার তরফে এমন প্রস্তাব পেয়ে চক্ষুচড়কগাছ বৈঠকে উপস্থিত কমিটির সদস্য শ্রমিক নেতাদের। পত্রপাঠ প্রস্তাবের তীব্র প্রতিবাদও করেন তাঁরা। অনেকেরই মত, খনিশিল্পে কেন্দ্রের ঢালাও বেসরকারিকরণে ফলে ইসিএলের এই নজিরবিহীন ‘ভাঁড়ে মা ভবানী’ অবস্থা।
কর্পোরেট জেসিসির মিটিংয়ে লাভ, ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসেব তুলে ধরে ইসিএল কর্তৃপক্ষ। বৈঠকে উপস্থিত শ্রমিক সদস্যদের দাবি, ইসিএল জানিয়েছে, গত অর্থবর্ষে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইসিএলের ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১০৫ কোটি ৫৭ লক্ষ। চলতি অর্থবর্ষে হিসেব অনুযায়ী অক্টোবর মাস পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ ৬৪৯.৪৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরেই ইসিএলের ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৫৫০ শতাংশ। বৈঠকে ইসিএল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংস্থার ভাঁড়ারে রয়েছে মাত্র এক হাজার কোটি টাকা! যা দিয়ে শ্রমিকদের পিএফ, এলআইসি ও ঠিকাদারদের বকেয়া মেটাতে হবে। বেতন দেওয়ার প্রয়োজনীয় অর্থ আর থাকবে না। সেই কারণে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, নভেম্বর মাসের বেতন ২২ ডিসেম্বর দেওয়া হবে। তীব্র প্রতিবাদ করে ওঠেন সদস্য শ্রমিক নেতারা। তাঁরা পাল্টা বলেন, প্রতি মাসের এক তারিখ ইসিএলের বেতন হতো। গত মাসে শ্রমিকরা ১২ তারিখ বেতন পেয়েছেন। এর থেকে একদিনও দেরি করা চলবে না। বেগতিক বুঝে কর্তৃপক্ষ বিকল্প প্রস্তাব দেয়। তাতে জানানো হয়, ১২ তারিখের মধ্যে অর্ধেক বেতন দেওয়া হবে। বাকি অর্ধেক বেতন ২২ তারিখ দিয়ে দেওয়া হবে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিভিন্ন বিদ্যুৎ সংস্থা রেকে করে ইসিএলের থেকে কয়লা নিচ্ছে না। তাই এবার ডিও’র মাধ্যমে সড়ক পথেই বেশি কয়লা বিক্রি করে লোকসান মেটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে রাজি হয়নি সিটু, আইএনটিটিইউসি, এইচএমএস, এআইটিইউসি সহ কোনও শ্রমিক সংগঠনই। পাশাপাশি, রবিবার কাজ করলে দ্বিগুণ বেতন দেওয়ার রীতিও তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল ইসিএল। আর্থিক সংকটের মোকাবিলা করতে এই উদ্যোগ বলে জানানো হয়। কিন্তু, শ্রমিক নেতারা সেই প্রস্তাবটিও খারিজ করে দিয়ে দাবি তোলেন, কোনও অবস্থাতেই চালু কোলিয়ারিতে শ্রমিকদের সানডে বন্ধ করা যাবে না। এ নিয়ে তুমুল দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন শ্রমিক নেতা ও সংস্থার আধিকারিকরা। শেষে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয় বলে জানা গিয়েছে।
সিটু নেতা গৌরাঙ্গ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘আমাদের কাছে যে হিসেব দেখানো হয়েছে, তাতে ইসিএলের এক বছরে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে ৫৫০ শতাংশ। বিভিন্ন বিদ্যুৎ সংস্থাকে কয়লা খনির বরাত দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন খনি বেসরকারি সংস্থার হাতে। ইসিএলের কয়লার উপর রয়েছে গুণ্ডা ট্যাক্স। তাই কেউ বেশি দাম দিয়ে কয়লা নিচ্ছে না। এই পরিস্থিতির জন্য কেন্দ্রীয় নীতি দায়ী। শ্রমিকদের কোনও দায় নেই। তাঁদের বেতন সময় মতো দিতে হবে। কয়লা খাদান শ্রমিক কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হরেরাম সিং বলেন, ‘শ্রমিকরা বেতন না পেলে বৃহৎ আন্দোলন হবে।’ বৈঠকের কিছু কথা ও ছবি দিয়ে প্রেস রিলিজ করলেও সমস্যাগুলি নিয়ে ইসিএলের কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।