সংবাদদাতা, রঘুনাথপুর: দীপাবলি নয় পুরুলিয়া জেলার গ্রাম বাংলার মানুষ কালীপুজোর সময় লৌকিক আলোর উৎসব ইঁজয় পিঁজয়ে শামিল হন। শহরাঞ্চলের বড়ো বড়ো দালান বাড়ি যখন বিভিন্ন রঙের বাতি, মোমবাতির আলোর রোশনাইয়ে ভেসে ওঠে তখন গ্রামের মানুষ ইঁজয় পিঁজয় উৎসব পালন করেন। আর তাতে গ্রামের আবাল, বৃদ্ধবনিতা সবাই শামিল হয়। তবে বর্তমানে যুব সমাজের উৎসাহের খামতির জন্য লোকিক এই উৎসব বিলুপ্তির পথে যেতে বসেছে।
কি এই লৌকিক উৎসব ইঁজয় পিঁজয়? দীপাবলির দিন গ্রামের বাসিন্দারা সবাই জায়গায় মিলিত হন। এরপর বাড়িতে অব্যবহৃত বিভিন্ন বাঁশের জিনিস ঝুড়ি, কুলা, পিছা, ঝাটাগুলি এক জায়গায় জড়ো করা হয়। সেইগুলিতে আগুন লাগানো হয়। সেই আগুনের স্পর্শ সবাই নেন। তাতে নাকি শরীরের রোগ ব্যাধি সব দূর হয়। উৎসব পালন নিয়ে প্রাচীন একটি লৌকিক কাহিনি কথিত রয়েছে। সেই কাহিনী অনুসারে, হোলিকা রাক্ষসী মারা যাওয়ার পর তাঁর দুই সাগরেদ দাদ ও খোঁস বেঁচে যায়। তাই কালীপুজো শুরুর আগে গ্রামে বাচ্চাদের মধ্যে দাদ ও খোঁসের প্রাদুর্ভাব বাড়ে বলে অভিমত। তাই সেই দুই অসুখকে বিলুপ্ত করতে ইঁজয় পিঁজয়ের আগুনের স্পর্শ নেওয়া হয়। তাতে রোগ সেরে যায়। যদিও এই কাহিনীর সত্যতা কোনো গ্রন্থে পাওয়া যায়নি।
অন্য এক কাহিনী অনুসারে এই সময় জমিতে আমন ধান পাকতে থাকে। তাই ফসলের নানারকম ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গের আক্রমণ ঘটে। সাধারণত কীটপতঙ্গ আলোয় আকর্ষিত হয়। তাই এই সময় আগুন জ্বালানো হয়। সেই আগুনের আকর্ষণে কীটপতঙ্গ সংস্পর্শে আসে এবং মারা যায়। অন্যদিকে, আগুনের যে ছাই হয় সেই ছাই ফসলের জমিতে দিলে কীটপতঙ্গের আক্রমণ হয় না। তবে এর পিছনে কতটা বৈজ্ঞানিক যুক্তি রয়েছে তা বলাই বাহুল্য।
তবে বিভিন্ন গ্রামবাসীদের মতানুসারে, পূর্বা পুরুষদের আমলে রঙিন আলোর জন্য মোমবাতি, বিজলি বাতি বা বর্তমানের মতো বিভিন্ন আলোর ব্যবস্থা ছিল না। তাই তারা আলোর উৎসব পালন করতে লৌকিক উৎসব ইঁজয়, পিঁজয় পালন করতে থাকেন। এই উৎসবে বাড়িতে জমে থাকা ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র ঝুড়ি, কুলা এক জায়গায় জড়ো করে পোড়ানো হয়। সেই সঙ্গে পাটের ছাল ছাড়িয়ে নেওয়ার পর যে পাকাটি পড়ে থাকত সেগুলিকে পোড়ানো হয়। হেমন্তে এভাবেই পালিত হয় আলোর উৎসব।
পেশায় শিক্ষক উজ্জ্বল গোপ, ধনঞ্জয় মণ্ডলরা বলেন, বর্তমানে গ্রামগুলিতেও দীপাবলি উৎসব পালন করা হয়। তবে লৌকিক উৎসব ইঁজয় পিঁজয় পালনে খামতি নেই। কিন্তু বর্তমানে যুব সমাজ উৎসব পালন থেকে পিছিয়ে আসছে। তাই আগের তুলনায় বর্তমানে উৎসবে কিছুটা ভাটা পড়েছে।



