


পরীক্ষা শেষ, পড়া নেই, কিছুদিনের নিরবচ্ছিন্ন অবসর। এই সময় কেমনভাবে কাটাবে আপনার সন্তান? থাকছে তারই হদিশ।
স্কুলের অ্যানুয়াল পরীক্ষা মোটামুটি সবারই শেষ হয়ে গিয়েছে। রেজাল্ট বেরতে এখনও খানিক বাকি। অতএব অখণ্ড অবসর। আর বাচ্চা এই সময়টা কেমনভাবে কাটাবে তাই ভেবেই নাজেহাল বাবা মা। মা যদি চাকরিরত হন, তাহলে তো সমস্যা আরও বেড়ে যায়। সারাদিন বাড়িতে সে একা একা করবেটা কী? বিদ্যজনে বলবেন গল্পের বই পড়ার অভ্যাস করুন, সব সমস্যা তাতেই মিটে যাবে। গল্পের বইয়ের নেশায় বুঁদ হয়ে শিশুর সময় যে কোথা দিয়ে কেটে যাবে টেরও পাবে না সে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় গল্পের বইয়ের নেশায় মত্ত শিশুটিরও পরীক্ষার পর ‘কী করি কী করি’ ভাব। তবে বেশ কিছু উপায় রয়েছে বাচ্চার অবসর যাপনকে আকর্ষণীয় ও সুখকর করে তোলার। খেলা, শেখা আর মনঃসংযোগ— এই তিনের সঠিক মিশ্রণে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সম্পূর্ণ হবে। কেমন সেই উপায়?
খেলার সঙ্গে শেখা
একটা রঙিন কাগজ। তা নানাভাবে ভাঁজ করতে করতে হয়ে গেল হাঁস। বাহ্, কী দারুণ ব্যাপার তাই না? শিশুটিও মজা পেয়েছে। শিখতে চায় হাঁস বানানোর নিয়ম। কচি হাতে ভাঁজ তুলছে সে কাগজে। খানিক ঠিক হচ্ছে, খানিক বা ভুল। তাও থামতে চায় না সে। মন দিয়ে ভুলগুলো শুধরে নিয়ে কাগজের হাঁস বানাতে প্রস্তুত। এইভাবে ঠেকতে ঠেকতে এক সময় সম্পূর্ণ হল হাঁস। শিশুর উল্লাস তখন দেখে কে! কাগজ দিয়ে অরিগ্যামি শেখানোর মাধ্যমে খেলা, শেখা আর মনোযোগ তিনটিই বাড়ানো সম্ভব। বেশ খানিকক্ষণ বাচ্চাটিকে এই কাজে ব্যস্তও রাখা যায়। হাঁস, কুকুর, খরগোশ, বিড়াল— শিশুটির নিজস্ব একটা জগৎ তৈরি হবে কাগজের এই খেলনাগুলো নিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এর থেকে কল্পনাশক্তিও বাড়বে।
কল্পনাশক্তি বাড়ানোর জন্য আবার এইগুলোর সঙ্গে একটা করে গল্প জুড়ে দিতে হবে বাবা মাকে। প্রথম দিকে গল্পগুলো বাবা মা-ই বানাবেন। পরবর্তীতে বাচ্চা নিজেই গল্প তৈরি করতে শিখে যাবে। তারও পরের ধাপে আসবে প্রকৃতিপ্রেম। সেটা কীভাবে? কাগজের তৈরি ফুল, পাখি বা পশুর পর এবার বাগানের প্রজাপতি, ফুল, রাস্তার কুকুর ছানা, বিড়াল ইত্যাদির প্রতি আকৃষ্ট হতে শিখবে শিশুটি। এবং তাদের নিয়ে নিজস্ব একটা জগৎ তৈরি হবে তার।
বইয়ের নেশা
একেবারে ছোট বয়স থেকেই বাচ্চাকে বইয়ের নেশা ধরিয়ে দিন। মায়েরা এই কাজটি সবচেয়ে ভালো পারবেন। শিশুকে ঘুম পাড়ানোর সময় গানের পাশাপাশি গল্পও শোনান। ছবির বইয়ের মাধ্যমে গল্পের বইয়ের প্রতি বাচ্চার আকর্ষণ তৈরি করুন। রঙিন ছবির বই, অল্প লেখার মাধ্যমে গল্প, রূপকথার গল্প, ছবিতে গল্প ইত্যাদি বই শিশুর হাতে তুলে দিন। জন্মদিন, পুজো, পয়লা বৈশাখ সহ বিভিন্ন বিশেষ দিনে অন্যান্য উপহারের পাশাপাশি শিশুকে একটা বইও দিন। প্রথম দিকে বইটা পড়ে শুনিয়ে, নাটকীয় গল্প বলার ছলেই বইয়ের প্রতি বাচ্চার আগ্রহ জাগিয়ে তুলুন। পরে সে নিজেই বইয়ের দুনিয়ায় বুঁদ হয়ে যাবে। বই পড়ার অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে। কল্পনাশক্তি বাড়ে, অক্ষরের প্রতি আগ্রহ জন্মায়, অনেকে তো ছবির বই দেখে আঁকতেও শেখে। আর তাছাড়া বানান সম্বন্ধে ধারণা, বাক্য গঠনের নানারকম খুঁটিনাটি শেখা ইত্যাদি তো আছেই। তবে এই কল্পনাশক্তি বাড়ানোই গল্পের বইয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক। শিশু যত বেশি কল্পনাপ্রবণ হবে, ততই তার সৃজনশীল বা ক্রিয়েটিভ দিকটা সমৃদ্ধ হবে। নিজের জগৎ তৈরি হবে, মতামত গঠিত হবে। এগুলো সবই বই পড়ার মাধ্যমেই সম্ভব।
খেলার জগৎ
এটা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস। বাচ্চার জীবনে যদি খেলার সুযোগ না থাকে তাহলে তার বাড়বৃদ্ধি সম্পূর্ণ হয় না। ‘অল ওয়ার্ক অ্যান্ড নো প্লে মেকস জ্যাক আ ডাল বয়’— তো প্রবাদেই পরিণত হয়েছে। বাস্তবেও এটাই সত্য। পড়া বা অন্যান্য কাজের মাঝে নির্মল খেলার সুযোগ দিতে হবে বাচ্চাকে। তার জন্য সময় মেপে দিতে পারেন। কিন্তু সেই সময় অন্য কিচ্ছু সে করবে না, শুধুই খেলবে। অনেক বাবা-মা খেলার কোচিং আর খেলার মধ্যে গুলিয়ে ফেলেন। তা করলে চলবে না। খেলার কোচিং একটা প্রশিক্ষণ আর নির্মল আনন্দের জন্য খেলা বিষয়টা আলাদা। তাতে কোনও ক্ষতি বা প্রাপ্তি নেই। শুধুই নিজের আনন্দে খেলা। সেটা বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে কুমিরডাঙা বা লুকোচুরি হতে পারে। পাশের বাড়ির দিদির সঙ্গে খেলনাবাটি বা কল্পনায় সে হয়ে উঠতে পারে শিক্ষিকা, অথবা পাড়ার মাঠে ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টনও খেলতে পারে। যার যেমন ভালোলাগে সে তেমনই খেলবে। কিন্তু এই সময়টা যাতে বাচ্চা পায় সেদিকে মা বাবাকেই খেয়াল রাখতে হবে।
প্রশিক্ষণমূলক কাজ
আপনার সন্তান হয়তো নাচতে ভালোবাসে অথবা ক্রিকেট খেলার প্রতি তার ভীষণ ঝোঁক। নয়তো সে বুঝি জলের পোকা। বেড়াতে গেলে তার প্রথম পছন্দ সমুদ্র। এমনিতে দুরন্ত বাচ্চাটিও হয়তো গানের নেশায় বুঁদ। আপনার সন্তানের শখ বা পছন্দ কোন বিষয়ে সেটা খেয়াল করুন। তারপর সেই ধরনের কোনও একটা প্রশিক্ষণ তাকে দিন। নাচ, গান, আঁকা, খেলা, সাঁতার, জিমনাস্টিক্স— যে কোনও একটা এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিতে যুক্ত করুন বাচ্চাকে। একইসঙ্গে অনেক ধরনের প্রশিক্ষণে যুক্ত করবেন না। সন্তানকে বহুমুখী প্রতিভা হিসেবে তৈরি করার বাসনা প্রায় সবক্ষেত্রেই বিফলে যায়। তারচেয়ে যে বিষয়টা আপনার সন্তান পছন্দ করে সেটাই শেখান তাকে। আগ্রহও বজায় থাকবে, একাগ্রতাও বাড়বে।
যোগাসন ও ফ্রি-হ্যান্ড
ছুটিতে অনেক বাচ্চাই জবুথবু হয়ে পড়ে। আলাদা করে হয়তো খেলাধুলো করার সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে সারাদিন বাড়িতে থেকে শারীরিক কিছু সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তাই রোজকার রুটিনে এক ঘণ্টার শরীরচর্চা যোগ করুন। যোগাসনের ক্লাসে ভর্তি করে সেখান থেকেই প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিতে হবে। তারপর তা বাড়িতেও অভ্যাস করতে পারে। এই যোগাসনের অভ্যাস কিন্তু স্কুল চালাকালীন করাও ভালো।
রোজ নিয়ম করে বাচ্চাকে কিছু এক্সারসাইজ করানোর অভ্যাস করুন। স্ট্রেচিং, ওয়ার্ম আপ ইত্যাদি খুবই ভালো এক্সারসাইজ। এছাড়াও স্কিপিং, রানিং, জগিং বা স্পট জগিং ইত্যাদিও বাচ্চাকে নিয়ম করে করানোর অভ্যাস রাখা দরকার। এতে তার ফিজিক্যাল মোবিলিটি বাড়বে এবং তা থেকেই বডি ফিটনেসও বাড়বে। অনেক বাচ্চা স্বভাবে চঞ্চল হয়, তাদের ক্ষেত্রেও যোগাসন খুবই ভালো এক্সারসাইজ। মনোযোগ বাড়ানো, মনকে শান্ত রাখা এসবই সম্ভব যোগাসনের মাধ্যমে।
কোয়ালিটি টাইম
বাচ্চার সঙ্গে সময় কাটানো খুবই জরুরি। মা বা বাবা কিংবা দু’জনেই দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময় বাচ্চার সঙ্গে কাটান। সারাদিনে সে কী কী করল, কতটা পড়ল, কোন খেলাটা খেলল, তার কী ভালোলাগে, কোনটা ততটা পছন্দ নয়— এইসবই বাবা-মায়ের নখদর্পণে থাকা জরুরি। এছাড়াও বাচ্চার সঙ্গে গল্প করুন। তার মতামত গুরুত্ব দিয়ে শুনুন। তার সঙ্গে খোলাভাবে মিশুন। এতে সন্তানের মানসিক বিকাশ ভালো হবে।
কমলিনী চক্রবর্তী