শোভন চন্দ, কলকাতা: ‘গিরিরাজের মতো বাপ পাব/ মেনকার মতো মা পাব/ দুর্গার মতো সোহাগী পাব/ কার্তিক গণেশ ভাই পাব...।’ গ্রামবাংলার বহু পুরনো ব্রতগান। শরতে সপরিবারে বাপের বাড়ি আসেন উমা। চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী, মায়ের ডানদিকে থাকেন গণেশ। বামে দেব সেনাপতি কার্তিক। কিন্তু বেহালার বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ির পুজোয় উলটপুরাণ। এখানে দেবীর বাঁদিকে সরস্বতীর সঙ্গে থাকেন গণেশ। আর লক্ষ্মীর সঙ্গে ডানদিকে কার্তিক। এভাবেই এই পরিবারে গত ২৩৫ বছর ধরে পূজিত হচ্ছেন মৃন্ময়ী মা।
১৭৯০ সাল। বাংলাদেশের ঢাকার বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে শুরু হয় পুজো। এই গ্রামেরই বাসিন্দা ছিলেন ধর্ম পরিব্রাজক অতীশ দীপঙ্কর ও গণিতজ্ঞ যাদবচন্দ্র চক্রবর্তী। পরিবারের অন্যতম সদস্য সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন পূর্বপুরুষ কৃষ্ণচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। সেইমতো মায়ের মূর্তি গড়া হয়। মায়ের বাঁদিকে গণেশ ও ডানদিকে জায়গা পান কার্তিক। এখানে মহিষাসুরের কোনও পা নেই। মহিষের পেট কেটে বেরিয়েছেন অসুর। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই পরিবারের প্রতিমা তৈরি করছেন শিল্পী বাসুদেব পাল। রথের দিন কাঠামো পুজো হয়। তারপরই শুরু হয় প্রতিমা নির্মাণের কাজ।
সমস্ত নিয়ম মেনে বৃহৎ নন্দীকেশ্বর পুরাণ মতে দেবীর আরাধনা করা হয়। শুরু থেকেই পাঁঠা বলি দেওয়ার প্রথা রয়েছে। ২০১৯ সাল পর্যন্ত নিয়ম মেনে বলি দেওয়া হতো। পরে বিশেষ পুজো করে বলি বন্ধ করা হয়েছে। এখন চালকুমড়ো বলি দেওয়া হয়। এখানেও এক বিশেষ রীতি রয়েছে। নবমীর দিন পুজোর শেষে শত্রু বলির আয়োজন করা হয়। তাতে অংশ নেন পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। কাদা মাটি দিয়ে অবয়ব তৈরি করা হয়। এরপর মানকচু পাতায় একটা অসুরের ছবি আঁকা হয়। কাদার উপর সেই মানকচু পাতাকে রেখে বলি দেওয়া হয়। সপ্তমী ও অষ্টমীতে দেবীকে নিরামিষ ভোগ দেওয়া হয়। নবমীর দিন আমিষ ও নিরামিষ, দু’ধরনের ভোগই হয়। আমিষ ভোগে থাকে বোয়াল, কই সহ নানা রকমের মাছ। পরিবারের সদস্যদের কথায়, এই ২৩৫ বছরে কখনও পুজো বন্ধ হয়নি। এমনকী করোনাকালে স্বল্প আয়োজনেও সম্পন্ন হয়েছে মায়ের পুজো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে পুজোর স্থান। দেশভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা ভুগিয়েছে উমাকেও। বদলেছে বাপের বাড়ির ঠিকানা। বাংলাদেশে থেকে ১৯৫৯ সালে কলকাতায় ঠাঁই হয় মা দুর্গার। সল্টলেক, গল্ফক্লাব রোড হয়ে বর্তমানে ঠিকানা বেহালার জয়শ্রী পার্ক। মহামারি, মন্বন্তর সব বাধা অতিক্রান্ত হয়েছে দেবীরই আশীর্বাদে।