Bartaman Logo
২১ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

প্রশাসনের উদাসীনতায় বুকে-পিঠে প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে পথে নামলেন বাবা

সিউড়ির বাবা অর্ধেন্দু সিংহের মেয়ে অমৃতা তিন মাস ধরে নিখোঁজ। প্রশাসনের উদাসীনতায় বাবার আকুল আবেদন, বিস্তারিত পড়ুন।

প্রশাসনের উদাসীনতায় বুকে-পিঠে প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে পথে নামলেন বাবা
  • ২১ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: একটা জলজ্যান্ত চব্বিশ বছরের মেয়ে। যে মাত্র কয়েকদিন আগেও  মা-বাবার চোখের সামনে হাসত, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখত। সেই মেয়েই আজ তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ! সে কি আজ খেয়েছে? সে কি আজ কোনো ছাদের নিচে ঘুমাচ্ছে, নাকি এই প্রখর রোদে-বৃষ্টিতে ফুটপাতে রাত কাটছে তার? না চশমা, না টাকা, না কোনো পরিচয়পত্র—এক কাপড়ে মেয়েটা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। এই তীব্র অনিশ্চয়তার আগুনে প্রতিটা মুহূর্ত পুড়ছেন সিউড়ির ডাঙ্গালপাড়ার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব অর্ধেন্দু সিংহ আর তাঁর স্ত্রী। দিন যায়, রাত আসে, কিন্তু এই হতভাগ্য দম্পতির চোখে এক ফোটা ঘুম নেই। বিছানায় পিঠ ঠেকালেই বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে—‘আমার মেয়েটা কোথায় শুয়ে আছে?’

Advertisement

যখন প্রশাসনের সব দরজা ঘুরেও কোনো খোঁজ মিলল না, যখন নেতা-মন্ত্রী থেকে শুরু করে ঠাকুরথান—কোথাও কোনো অলৌকিক হাত বাড়িয়ে দিল না তাঁদের দিকে, তখন সব লোকলজ্জা, সমাজ আর বয়সের ক্লান্তি ছুঁড়ে ফেলে রাস্তায় নামলেন এক বাবা। ষাটোর্ধ্ব এক প্রবীণ মানুষ, যাঁর চুলে পাক ধরেছে, তিনি নিজের বুকে আর পিঠে ঝুলিয়ে নিয়েছেন ব঩ড়ো বড়ো প্ল্যাকার্ড। সেই প্ল্যাকার্ডে সাঁটা রয়েছে তাঁর মেয়ে অমৃতার ছবি। মেয়ের গায়ের রঙ, চেহারার বর্ণনা আর নিচে লেখা একটা মোবাইল নম্বর। 
অর্ধেন্দুবাবু রামপুরহাট, মল্লারপুর থেকে রাজগ্রাম- সর্বত্র ঘুরছেন। পোস্টার লাগিয়েছেন, সমাজ মাধ্যমে আকুতি জানিয়েছেন মেয়েকে খুঁজে পেতে। কোনো লাভ হয়নি। তাই এবার নিজেই গলায় পোস্টার ঝুলিয়ে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ঘুরে বেড়াচ্ছেন অর্ধেন্দুবাবু। চেনা-অচেনা যাকে দেখছেন তাঁর সামনে গিয়ে হাত জোড় করছেন, দু’হাত চেপে ধরছেন আকুল হয়ে—বাবা, আমার মেয়েটাকে কোথাও দেখেছেন?
ঘটনাটি গত ১৩ মার্চ দুপুরের। চব্বিশ বছরের বি-ফার্ম পাশ করা মেধাবী মেয়ে অমৃতা কাউকে কিছু না বলেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান। ঘর থেকে বেরোনর সময় মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সা কিংবা কোনো প্রয়োজনীয় নথিপত্রও নেননি। দীর্ঘক্ষণ বাড়ি না ফেরায় স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়ে পরিবারের। আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের বাড়িতে হন্যে হয়ে খুঁজেও যখন মেয়ের কোনো সন্ধান মেলেনি, তখন ওইদিনই সিউড়ি থানার দ্বারস্থ হন অমৃতার বাবা অর্ধেন্দুবাবু। 
পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজে দেখেছে, অমৃতা সিউড়ি থেকে বাসে চড়ে রামপুরহাটের রাজগ্রাম পর্যন্ত গিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর? সেই রাজগ্রামের খাঁ-খাঁ রাস্তার মোড়েই যেন মিলিয়ে গেল মেয়েটা। পুলিশের তদন্তের দৌড় ওইটুকুই। 
পরিবারের দাবি, বি ফার্ম করার পর এম ফার্মে ভর্তিও হয়েছিলেন অমৃতা। নিজের যোগ্যতায় ও পরিশ্রমে স্বনির্ভর হওয়ার প্রবল জেদ ছিল মেয়ের মধ্যে। কিন্তু সুযোগ পাচ্ছিলেন না। পরিবারের সাহায্য ছাড়াই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এই তীব্র ইচ্ছা থেকেই কি অমৃতা কোনো মানসিক উদ্বেগের শিকার হয়েছিলেন? অর্ধেন্দুবাবুর কথায়, আমি মেয়েকে অনেকবার বলেছি, বিভিন্ন জায়গায় চাকরির আবেদন করতে। কিন্তু ও নিজের মধ্যেই সবসময় দুশ্চিন্তা করত। 
শনিবার রামপুরহাটে বিধায়ক থেকে শুরু করে স্থানীয় ক্লাব, থানা—সব জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত অর্ধেন্দুবাবুর গলা দিয়ে আর আওয়াজ বেরোচ্ছিল না। চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে নামছিল জল। কান্নাভেজা গলায় অসহায় বাবার আর্তি, আমি আর কিচ্ছু চাই না ভগবান, আমি শুধু আমার মেয়েটাকে অক্ষত অবস্থায় একবার কোলে ফিরে পেতে চাই। -নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ