নিজস্ব প্রতিনিধি, চাপড়া: গ্রাম্য বিবাদের কারণে একই গ্রামে খুন হয়েছিলেন ১৩ জন বাসিন্দা! দুই গোষ্ঠীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে দফায় দফায় উত্তপ্ত হয়েছিল গ্রাম। দু’ দশক আগের সেসব দিনের কথা আজও ভুলতে পারেননি চাপড়া ব্লকের মহেশনগর গ্রামের বাসিন্দারা। এলাকায় কখনও ঝামেলা-অশান্তির আঁচ পড়লেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বয়োজ্যেষ্ঠরা। এই বুঝি ফের হানাহানির দিন শুরু হল। চিন্তায় ঘুম উড়ে যায় তাঁদের। এই আশঙ্কার দিনযাপনের মধ্যেই, বহু বছর বাদে মহেশনগর গ্রামে ফের খুন। এবারও সেই গোষ্ঠী বিবাদ। ঝামেলার সূত্রপাত জমি দখলকে কেন্দ্র করে। অনেকেই মনে করছেন, এই ঝামেলা হয়তো এত তাড়াতাড়ি মেটার নয়। অভিযুক্তদের মাথায় রয়েছে চাপড়ার বড়বড় দাদাদের ‘রাজনৈতিক’ হাত। এমনিতেই হাতিশালা-১ পঞ্চায়েতের মহেশনগর এলাকা ‘বোমা-গুলি’র গ্রাম হিসেবে খ্যাত। আর সেই আগুনে বছরের পর বছর আঁচ দিয়ে এসেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বড় বড় নেতারা। যাদের গোষ্ঠী সংঘর্ষে আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে গ্রাম। চাপড়ার অনেকেই বলেন, ‘মহেশনগরে পান থেকে চুন খসলেই বোমা গুলি বেরিয়ে পড়ে’। উল্লেখ্য, গত বুধবার সকালে জমি নিয়ে বিবাদকে কেন্দ্র করে তিন গোষ্ঠীর মধ্যে লড়াই হয়। তাতে আলহামদো শেখ নামে একজন মারা যান। বোমার আঘাতে দুজন গুরতর জখম হন। মৃতের পরিবারের তরফ থেকে দশ জনের বিরুদ্ধে চাপড়া থানায় অভিযোগ করা হয়। যার মধ্যে বুধবারই বিএসএফের কনস্টেবল রিজাউল করিমকে আগেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে বেশি রাতের দিকে আফফান শেখ নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করে চাপড়া থানার পুলিস। ধৃতদের বৃহস্পতিবার কৃষ্ণনগর আদালতে তোলা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতদিনের পুলিস হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। কৃষ্ণনগর পুলিস জেলার ডিএসপি শিল্পী পাল বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত দুজন গ্রেপ্তার হয়েছ। বাকিদের খোঁজে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।’ বৃহস্পতিবার মন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাস, সভাধিপতি তারান্নুম সুলতানা মির এবং চাপড়ার বিধায়ক রুকবানুর রহমান মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। গ্রামবাসীদের কথায়, মহেশনগর গ্রামে বোমা-গুলির পুরোনো ইতিহাস রয়েছে। ১৯৯৫-৯৬ সাল নাগাদ গ্রামের অবস্থা ভয়ঙ্কর ছিল বলে দাবি গ্রামবাসীদের। বাম-কংগ্রেসের মদতে দুই গোষ্ঠী এলাকা দখলে সম্মুখ সমরে নামত। দুই গোষ্ঠীর নাম ছিল মল্লিক গোষ্ঠী ও ফণা গোষ্ঠী। প্রতি বছর বিভিন্ন অশান্তিকে কেন্দ্র করে দুই গোষ্ঠী সদস্যরা খুন হতো। গুলি করে, বোমা ছুঁড়ে, কুপিয়ে একে অপরকে খুন করত গোষ্ঠীর লোকজন। শোনা যায়, তখনও জমি নিয়েও নাকি তাদের মধ্যে লড়াই হয়েছিল। সংঘর্ষের মধ্যেই গ্রামের এক ডাক্তার বিনা অপরাধে খুনে হওয়ার পর, সেই লড়াই থেমে যায়। ২০০০ সালের পর থেকে গোষ্ঠী বিবাদের কারণে আর নাকি কাউকে খুন হতে হয়নি। তবে ঝামেলা লেগেই থাকে মহেশনগর গ্রামে। সৌজন্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের লড়াই। এখন জমি দখলকে কেন্দ্র করে মাঝেমধ্যেই সেই গ্রামে ঝামেলা লাগে। যা নিয়ে উদ্বিগ্ন আদি বাসিন্দারা। পঞ্চায়েত প্রধান রূপচাঁদা শেখ বলেন, ‘বহু বছর আগে আমাদের এই গ্রামে অনেক খুন হয়েছে। আমরা তখন ছোট। সেই সময় দফায় দফায় সংঘর্ষে দুই গোষ্ঠীর ১৩ জন মার্ডার হয়েছিল। এখন গ্রামে জমি নিয়ে অশান্তি লাগলে সালিশি সভায় তা মিটিয়ে দেওয়া হয়।’



