অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: শ্মশানে সারাদিনে ক’টা দেহ দাহ করা হল, তা গোনাই ছিল দিগন্ত পালের কাজ। সঠিক সময়ে সেই তালিকা পৌঁছে দিতে হতো পুরসভায়। সেই দিগন্ত শ্মশান ছাড়িয়ে হয়ে উঠলেন পুরসভার নিয়ন্ত্রক! সৌজন্যে, কাটোয়ার প্রাক্তন বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের স্নেহ-ভালোবাসা। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই দিগন্তের দাপট এতটাই বাড়ে যে চেয়ারম্যান, কাউন্সিলার থেকে শুরু করে পুরকর্মীরাও তাঁকে যমের মতো ভয় পেতেন। বিধায়কের ‘ঘরের ছেলে’ বলে কথা! দেখতে দেখতে দিগন্ত যে কবেই মৃতদেহের হিসাবরক্ষক থেকে কোটিপতি বনে গিয়েছেন তা সম্ভবত নিজেও টের পাননি। কাটোয়াবাসীওটের পেলেন অনেক পরে।
বিধায়ক ঘনিষ্ঠ দিগন্তকে নানা অপকর্মের অভিযোগে সম্প্রতি গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার পর থেকেই মুখ খুলছেন শহরের লোকজন। দিগন্তরা দুই ভাই। বড় দাদা একদা বাম জমানায় সিপিএমের কেষ্টবিষ্টুদের আশীর্বাদ পেয়েছিলেন। দিগন্ত ছোট। বাম রাজনীতির সংস্রব এড়িয়ে চলতেন বরাবরই। উলটে তিনি ভিড়ে যান তৃণমূলে। ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন বিধায়ক রবীন্দ্রনাথের। তারপর পুরসভায় চাকরি। তারপর পুরসভার প্রতিটি টেবিলকে কব্জা করার চেষ্টা। অভিযোগ, শহরের কেউ বিল্ডিং প্ল্যান পাশ করাতে দক্ষিণা দিতে হতো দিগন্তকে। চেয়ারম্যানের ক্ষমতা ছিল না দিগন্তের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কোনও কাজ করার। পরে দিগন্ত খুলে ফেলেন একটি প্ল্যাইউডের দোকান। অনেকেই বলছেন, আয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রাখতেই দোকানটি সম্ভবত খোলা হয়েছিল।
এখানেই শেষ নয় দিগন্তের কীর্তি। শহরের একাধিক বাড়ি দখলের অভিযোগও উঠছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে, থানায় যাওয়ার সাহস এতদিন কারও ছিল না। শহরের বাসিন্দারা এখন বলছেন, ইডি তদন্ত না করলে দিগন্তের বেআইনি সম্পত্তির হিসাব মুশকিল। নিদেনপক্ষে আয়কর দপ্তর এসে দেখুক সামান্য একজন পুরকর্মী কেমন সাম্রাজ্য বানিয়েছে। ক’বছর আগে শহরের স্টেশন রোডে স্টার মর্যাদার একটি হোটেল গড়ে ওঠে। সেটি আসলে দিগন্ত ঘনিষ্ঠ এক ব্যবসায়ীর। অভিযোগ, ওই হোটেলের জমি নাকি কম টাকায় সেটেলেমেন্ট হয়েছিল দিগন্তের সৌজন্যে। তাঁরই দৌলতে পুরসভার জমিতে দাদা (দিগন্তের বড় দা) গড়ে তুলেছিলেন ব্যক্তিগত ট্রান্সফর্মার কারখানা। ওই জমি বছর দশেক আগে নামমাত্র টাকায় পেয়েছিলেন তিনি।
কাটোয়াবাসী বলছেন, অত্যন্ত কৌশলের সঙ্গে শহরে যাবতীয় অপকর্ম করে বেড়াতেন দিগন্ত। তাঁর নিজস্ব একটা বাহিনী ছিল। দিগন্তকে তাঁরা ‘বিশিষ্ট সমাজসেবী’ বলে প্রচার করত। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হতো। আর এই ‘সমাজসেবী’র বর্ম পড়ে দৌরাত্ম্য চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। বেগুনকোলা বালির ঘাট, রসুইয়ের অজয়ের বালির ঘাটগুলি থেকে প্রতিদিন নিয়ম করে প্রণামী যেত তাঁর কাছে। প্রাক্তন এক পুলিশ অফিসারের সঙ্গে দহরম-মহরমও শহরবাসীর অজানা নয়।
দিগন্ত গ্রেপ্তার হতেই শহরের ক্রিকেট উৎসব নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এই ক্রিকেট টুর্নামেন্টের মূল উদ্যোক্তা ছিল বাবুলাল শেখ, সুপ্রিয় মুখোপাধ্যায়রা। লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করা হতো। দ্বিতল গ্যালারি নির্মাণ করা হতো। এইসব আয়োজনে কোথা থেকে আসত বিপুল টাকা? শহরের বাসিন্দারা চাইছেন, দিগন্তের সব কীর্তিই তদন্তের আওতায় আনা হোক। • দিগন্ত পাল। -নিজস্ব চিত্র