


আনন্দ সাহা, লালবাগ: আজ, বুধবার পয়লা বৈশাখ অর্থাৎ বাংলা বছরের প্রথম দিনে নবগ্রাম থানার সতীপীঠ কিরীটেশ্বরী মন্দিরে পুজো দিতে ভক্তদের ঢল নামবে। এদিন ভোরের আলো ফুটতেই পুজোর ডালা নিয়ে ভক্তরা মন্দিরে হাজির হবেন। সংসারের সুখ-শান্তি, ব্যবসায় সমৃদ্ধি ও কর্মক্ষেত্রে উন্নতির কামনায় দেবীর উদ্দেশ্যে পুজো ও অঞ্জলি নিবেদন করবেন। বছরের প্রথম দিনে সতীপীঠে পুজো দিতে মঙ্গলবার রাতেই কয়েকশো ভক্ত এসে পৌঁছান। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ হোটেলে রাত কাটিয়ে সকালেই মন্দিরে পৌঁছে যাবেন । পুজো পর্ব সেরে নবাবের শহরের দর্শনীয় স্থানগুলি তাঁরা ঘুরে দেখবেন।
দু’বছর আগে সতীপীঠ কিরীটেশ্বরী ভারতের সেরা পর্যটন গ্রামের শিরোপা পায়। তারপর থেকে পয়লা বৈশাখে সতীপীঠে ভক্তের সংখ্যা বেড়েছে। চলতি বছরেও প্রচুর সংখ্যায় ভক্ত সমাগম হবে-এমনটাই মনে করছেন মন্দির কমিটি থেকে জেলা পর্যটন দপ্তরের আধিকারিকরা।
মুর্শিদাবাদ জেলার বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক প্রাচীন কালীবাড়ি রয়েছে। নবগ্রামে রয়েছে সতীপীঠ কিরীটেশ্বরী, বহরমপুরে করুণাময়ী, দয়াময়ী মন্দির, লালগোলায় রাজরাজেশ্বরী মন্দির, কান্দির দোহালিয়া কালীবাড়ি, জিয়াগঞ্জের আমুইপাড়া কালীবাড়ি প্রভৃতি। জেলার বিভিন্ন প্রান্তের এই কালীমন্দিরগুলিতে পয়লা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষের সকাল থেকে পুজো দিতে বহু মানুষের সমাগম হয়।
কিরীটেশ্বরী মন্দির হল হিন্দু শাক্ত মতের পবিত্র তীর্থ পীঠগুলির অন্যতম। মুর্শিদাবাদ জেলার নবগ্রাম থানার কিরীটেশ্বরী মৌজায় কিরীটেশ্বরী মন্দির সম্ভবত নবাবের জেলার প্রাচীনতম মন্দির। দেবীর নাম অনুসারে গ্রামের নাম হয়েছে কিরীটেশ্বরী। তান্ত্রিকমতে এবং পীঠনির্ণয় ও পুরাণ কাহিনি অনুসারে এখানে দেবী দক্ষিয়ণী সতীর কিরীট অর্থাৎ মুকুটের কণা পতিত হয়েছিল। এজন্য এই স্থানটিকে মহাপীঠ বলে। আবার এখানে দেবীর কোনো অঙ্গ পতিত না হয়ে ভূষণ পতিত হয়েছিল, তাই এই স্থানকে তন্ত্রবিদপূর্ণ পীঠস্থান না বলে উপপীঠও বলা হয়ে থাকে। তবে এনিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে।
পৌষ মাসের প্রতি শনি ও মঙ্গলবার হাজার হাজার ভক্ত সমাগম হয়। তবে বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনে ভক্ত সমাগম নেহাত কম হয় না। নবগ্রাম ব্লকের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ কিরীটেশ্বরী মন্দিরে আসেন। সকাল থেকেই মন্দিরের সামনে ভক্তদের লম্বা লাইন পড়ে যায়। মন্দিরের প্রধান সেবাইত দিলীপ ভট্টাচার্য বলেন, কিরীটেশ্বরী একটি সতীপীঠ। বছরের বিশেষ দিনগুলিতে মন্দিরে বহু মানুষের সমাগম হয়। পয়লা বৈশাখ আমবাঙালির জীবনে একটি বিশেষ দিন। কাজেই এই বিশেষ দিনে সাংসারিক সুখ-শান্তি এবং সমৃদ্ধির প্রার্থনায় মায়ের কাছে আসেন। পুজো ও অঞ্জলি নিবেদন করে মায়ের আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। বহরমপুরের বিষ্ণুপুরের করুনাময়ী এবং কাশিমবাজারের দয়াময়ী এবং নতুন বাজারের জয়কালী মন্দিরেও পুজো দিতে প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। দিনের আলো ফোটার আগেই বিষ্ণুপুর কালীমন্দিরে সামনে পুজো দেওয়ার জন্য ভক্তদের লম্বা লাইন পড়ে যায়। মন্দিরের পাশের মাঠে এবং রাস্তায় দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা যায়। ভক্তদের ভিড়ে রাস্তা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ভিড় সামলাতে পুলিশ ও সিভিক ভলান্টিয়ারদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়।
মন্দিরের সেবাইত বিতশোক পান্ডে বলেন, বিষ্ণুপুর কালী বা করুণাময়ী মায়ের খ্যাতি জেলার বাইরেও রয়েছে। নতুন বছরে ব্যবসায়িক কাজকর্ম শুরু করার আগে মায়ের আশীর্বাদ নিতে পুজো দিতে আসেন। ভক্তদের ভিড় এতটাই বেশি থাকে যে রাত পর্যন্ত পুজো চলে।
বহরমপুর কান্তনগরের বাসিন্দা অন্নপূর্ণা ধর বলেন, প্রতিবছর ভোরে উঠে স্নান সেরে মন্দিরে চলে যাই। সকাল সকাল পুজো দিয়ে মায়ের আশীর্বাদী ফুল নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। লালগোলা রাজাদের কালী রাজরাজেশ্বরীকে লালগোলাবাসী অত্যন্ত জাগ্রত বলে মানেন। লালগোলার এই কালীমন্দিরে দিনভর পুজো চলে। কান্দির দোহালিয়া কালীবাড়িতেও বহু ভক্ত আসেন। কান্দি শহরের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকেও পুজো দিতে ভক্তরা আসেন। জিয়াগঞ্জের আমাইপাড়া কালীবাড়িতেও বহু ভক্ত সমাগম হয়। গোকর্ণের শ্যামরাই কালী মন্দিরেও এদিন স্থানীয়দের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ পুজো দিতে আসেন।