


ভোটের ঢাকে কাঠি পড়লেই রাস্তঘাটে বাসেট্রেনে অফিসকাছারিতে নানা গুঞ্জন কাছে আসে। কিছু ব্যক্তি মনে মনে ‘ক’ দল বা জোটকে সমর্থন করেন। জনমনে দলটির বিশেষ জায়গা না-থাকা সত্ত্বেও তাঁরা এই মন্তব্য ভাসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, এবার ‘ক’-এর পক্ষে চোরাস্রোত বইছে। মানে পরোক্ষে ‘ক’-এর জয়ের সম্ভাবনা জিইয়ে রাখলেন তাঁরা। এমন মন্তব্যের প্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক বিতর্ক জমে ওঠে। পক্ষে বিপক্ষে নানা মত বেরোতে থাকে আর এগিয়ে আসে ভোটের লাইনে দাঁড়াবার দিন। পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস সেইদিক থেকে যথেষ্ট ভাগ্যবান। তারা কোনো চোরাস্রোতের মধ্যে নেই। বহু ভোটার সরাসরি জানিয়ে জানিয়ে দিচ্ছেন, ‘আমরা দিদিকেই ভোট দেব।’ উত্তরবঙ্গ থেকে জঙ্গলমহল, সুন্দরবন থেকে মহানগর—দিকে দিকে একই ভাষায় কথা বলছেন নারী পুরুষ নবীন প্রবীণ প্রভৃতি সবধরনের ভোটদাতা। কারণ তাঁদের মাথায় এটাই ঢুকে গিয়েছে যে, ‘২৯৪টি আসনে আমিই (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) প্রার্থী।’ শুধু মুখে বলেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না মমতা-অভিষেকের সৈনিকরা, সাহস করে কেউ কেউ বিবাদেও জড়িয়ে পড়ছেন বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম প্রভৃতি বিরোধীদের সঙ্গে। দিদির পক্ষে মুখ খোলার জন্য দু-এক জায়গায় তৃণমূল সমর্থকরা হেনস্তারও শিকার হচ্ছেন। তবু কেউ ভয় পাচ্ছেন না, ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছেন না, বরং রুখেই দাঁড়াচ্ছেন। স্বভাবতই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল জয়-পরাজয় নিয়ে কোনো সম্ভাবনার অঙ্ক কষছে না। বরং আত্মবিশ্বাস বাড়ছে জোড়াফুলের সব প্রার্থীর। বিশেষ করে যখন ভোটাররাই আশ্বাস দেন, ‘এবার জয়ের মার্জিন ৪০ হাজার নয়, ৫০ হাজার করে দেব আমরা’, তখন মমতা-অভিষেক নিশ্চিন্ত না-হওয়ার কারণ দেখেন না। মমতা দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করে দেন, ‘বাংলায় সরকার গড়ব আমিই। এবার আমাদের আসন সংখ্যাও বাড়বে।’ তাঁর কণ্ঠ বাংলা ও বাঙালিকে আরো ভরসা দেয়, ‘বাংলা দখলের পর দিল্লিও দখল করব। মোদির পতন শুরু হয়ে গিয়েছে।’
লোকসভা, বিধানসভা নির্বাচনের আগে রকমারি জনমত সমীক্ষা রিপোর্ট সামনে আনা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেই রিপোর্ট মেলে না বা থাকে না বাস্তবের ধারেকাছে। কালেভদ্রে মেলেও দু-একটি রিপোর্ট, ব্যাপারটা ঝড়ে দুর্ভাগা কাকের মৃত্যু নিয়ে ফকিরের কেরামতি বৃদ্ধির গপ্পো মাত্র। বাংলায় এবারের বিধানসভা নির্বাচন নিয়েও একাধিক জনমত সমীক্ষা হয়েছে বলা হচ্ছে। সেসব রিপোর্টও সামনে এনেছে সমীক্ষক দলগুলি। তবে গোপন চেষ্টা সত্ত্বেও বিজেপির পক্ষ নিয়ে উদ্বাহু হয়নি কেউ। বরং মমতার প্রত্যাবর্তনের পক্ষেই মতপ্রকাশ করেছে সকলে। এটাই যে স্বাভাবিক এবং হতেও যাচ্ছে, তার কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের মূল ভরসা তাঁর সরকারের ধারাবাহিক উন্নয়ন এবং দলীয় কর্মীদের নিববচ্ছিন্ন জনসংযোগ, সমস্ত প্রয়োজনে মানুষের পাশে থাকা। অন্যদিকে, বিজেপির একটাই কীর্তি—কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল হিসাবে বাংলা ও বাঙালির বিরোধিতায় ধারাবাহিকতা রক্ষা। এসআইআর ইস্যুতেও বিজেপি শেষমেশ খাস্তা হল সুপ্রিম কোর্টে। মমতার ভোটব্যাংক টুকরো করার খেলাটি জমেও জমল না। সোজা কথায়, একদশক যাবৎ বিজেপির ব্যাপক লম্ফঝম্প যে মাঠে মারা যাচ্ছে তা খোলসা হচ্ছে দ্রুত।
ভোট যত এগিয়ে আসছে মোদি-শাহদের হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে নানাভাবে। দিকে দিকে মরণকামড় দিতে উদ্যত কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলি। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) ব্যর্থতা পুষিয়ে দিতে এবার আসরে আয়কর বিভাগ (আইটি)। সিবিআই, ইডি, এনআইএ-র দোসর এবার আইটি! তারা দুর্নীতিদমনের নামে মমতার দলের প্রার্থীদের জনসমক্ষে ছোটো করার খেলায় নেমেছে। বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী টিএমসির প্রচার প্রক্রিয়া ব্যাহত করার শেষ চেষ্টা নিয়েছে তারা। পাশাপাশি লোকসভার পাশাখেলাতেও গোহারা হলেন মোদি ও তাঁর সম্প্রদায়। মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণের নামে ডিলিমিটেশনের মাধ্যমে লোকসভার আসন সংখ্যা বৃদ্ধির প্ল্যান নিয়েছিলেন শাহ। হাজার চেষ্টাতেও বাংলা দখলের ধারেকাছে পৌঁছাতে পারেনি পদ্মপার্টি। এমনকি দক্ষিণ ভারতেও তাদের বৃদ্ধির গ্রাফ খারাপ। বস্তুত গোলেয়ের দলই রয়ে গিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি। কিন্তু এই প্রবণতা দলটির জন্য বিপজ্জনক। তাই মহিলাদের আসন সংখ্যা বৃদ্ধির অছিলায় গোবলয়ের রাজ্যগুলিতে আসন সংখ্যা প্রয়োজনমতো বাড়িয়ে নেওয়ার মতলবে ছিলেন মোদিবাবুরা। তাদের এই কৌশল সফল হলে সংসদে দক্ষিণ ভারত, বাংলা প্রভৃতি স্থানের অংশীদারিত্ব অনেকখানি হ্রাস পেত। সেই ছক পুরো ঘেঁটে গিয়েছে বিরোধীরা এককাট্টা হয়ে বিলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ায়। আশা করা যায়, দিল্লি থেকে মোদি হটানোর ডাক উঠলেই বিজেপি টের পেয়ে যাবে বিরোধীরা এই প্রশ্নে এখনো এককাট্টা। আগামী দিনে তারা সফলও হবে।