Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

প্রিয় সাহিত্যিক

আগামী শনিবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা। বাংলা সাহিত্যে রয়েছে অসংখ্য মণিমাণিক্য।

প্রিয় সাহিত্যিক
  • ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

আগামী শনিবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাংলা আমাদের মায়ের ভাষা। বাংলা সাহিত্যে রয়েছে অসংখ্য মণিমাণিক্য। একুশে ফেব্রুয়ারির আগে নিজেদের প্রিয় সাহিত্যস্রষ্টার কথা জানাল পূর্ব বর্ধমানের জৌগ্রাম হাই স্কুলের  
পড়ুয়ারা। ছবিও আঁকল তাঁরা।

Advertisement

শিকল ভাঙার প্রেরণা
বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহ, স্বদেশ চেতনা ও মানবমুক্তির এক অনন্য প্রতীক কাজী নজরুল ইসলাম। পরাধীন ভারতের রাজনৈতিক শোষণ, সামাজিক অবিচার ও মানুষের দাসত্ব তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। তাই তাঁর সাহিত্য হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের শক্তিশালী অস্ত্র। তিনি বিশ্বাস করতেন— যেখানে অন্যায়, সেখানেই বিদ্রোহ অপরিহার্য। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় তাঁর দুর্বার আত্মপ্রকাশ শাসক শ্রেণিকে স্তম্ভিত করেছিল এবং সাধারণ মানুষের মনে প্রতিরোধ জুগিয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লেখালেখির জন্য তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। তবুও তিনি আদর্শচ্যুত হননি। কারাগারের শিকল নজরুলের চিন্তাধারাকে বন্দি করতে পারেনি। ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ গানে বন্দি জীবনের যন্ত্রণা রূপ নিয়েছে মুক্তির বজ্রনিনাদে। এই গানের মাধ্যমে তিনি জেলখানার গরাদ ভাঙার ডাক দিয়েছেন। তাঁর কাছে স্বাধীনতা ছিল মানুষের আত্মমর্যাদা ও মানবিক অধিকারের প্রশ্ন। তাই তাঁর সাহিত্য আজও দেশপ্রেম ও প্রতিবাদের চেতনা জাগায়। বর্তমান সমাজেও তিনি ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে শেখান।
 —পৌষী মুখোপাধ্যায়  অষ্টম শ্রেণি

আমার কবি
 বাঙালির মনে শ্রেষ্ঠ কবির চিরস্থায়ী আসনে বসে আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই নামটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে ‘সহজ পাঠ’ বইটিতে। আর মায়ের মুখে শুনতাম তাঁর নানান কবিতার ছন্দ। ‘প্রশ্ন’ কবিতার লাইন ‘মাগো আমায় ছুটি দিতে বল / সকাল থেকে পড়ছি যে মেলা’— আমার বয়সি ছেলেমেয়েদের মনের কথা। আবার ‘বীরপুরুষ’ কবিতায় মায়ের সেই ছোট্ট বীরপুরুষটির মতো বীরত্ব-বিলাস সব কিশোরের মতোই আমরাও মনোজগতের অভিলাষ। ‘লুকোচুরি’ কবিতা শুনে মনে হত আমিও সেই খোকার মতোই লুকিয়ে মাকে ভাবিয়ে তুলব। এভাবেই রবি ঠাকুরের কবিতা পড়তে পড়তে, তাঁকে চিনতে চিনতে জীবনের সপ্তম সিঁড়িতে এসে দাঁড়িয়েছি। মা বলেন, সব সিঁড়ি পার হয়েও দেখবি উনি আছেন তোর সঙ্গে ঠিক রবির আলোর মতোই।
—সৌমিলি ঘোষ  সপ্তম শ্রেণি

প্রকৃতি চেতনা ও পথের পাঁচালি
 দর্পণ মাত্রই রূপকে প্রতিবিম্বিত করে। কথাসাহিত্যিক 
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্য দর্পণে গ্রাম্যজীবনের 
সুস্পষ্ট রূপ প্রতিফলিত হয়। তাঁর সাহিত্যে গ্রামবাংলা প্রকৃতি কেবল 
এক পটভূমি নয়, বরং তা এক জীবন্ত চরিত্র। যা মানুষের আনন্দ 
বেদনার সঙ্গে মিশে থাকে। শৈশবের স্মৃতি, কাশবন, নদী, 
বাঁশঝাড় এবং সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রাম তাঁর লেখায় নিবিড়ভাবে ফুটে ওঠে। এই গ্রামবাংলার প্রকৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত তাঁর সাহিত্য দর্পণের অন্যতম প্রতিবিম্বিত রূপ হল ‘পথের পাঁচালি’। প্রকৃতি বিনা মানুষ ও তার চেতনা পূর্ণতা লাভ করে না। আবার মানুষের অস্তিত্ববিহীন প্রকৃতিও সর্বাংশে অসম্পূর্ণ। সমাজ ও সময়ের দ্বৈরথে অতি সাধারণ দরিদ্র জীবনের কল্পনাপ্রবণ শৈশব ও কৈশোর কাল কীভাবে প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্যের সাহচর্যে আনন্দযাপনের রসদ খুঁজে জীবনকে গতিময় ও রোমাঞ্চকর করে তুলতে পারে, তার সন্ধান দিয়েছেন পথের পাঁচালির স্রষ্টা।
— শিঞ্জন চক্রবর্তী  নবম শ্রেণি

রূপসী বাংলার কবি
 রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতা ধারায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম জীবনানন্দ দাশ। বঙ্গ প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যের বর্ণনাতে বাংলা সাহিত্যে তাঁর সমতুল্য কবিও খুবই কম আছেন। গ্রামবাংলার নির্জনতায় নিমগ্ন কবি ধানসিঁড়ির তীরে বসে সৌন্দর্য দেখতে দেখতে মোহিত হয়ে ‘পৃথিবীর রূপ’ খুঁজতে চাননি। কারণ রূপসী বাংলার রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধে তিনি এমন বিভোর যে, জন্মজন্মান্তর এই বাংলাতেই ফিরে আসতে চান মানুষ বা শঙ্খচিল, শালিখ, কাক, বক কিংবা হাঁস হয়ে। জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় বঙ্গ প্রকৃতির চেনা-অচেনা, নাম না জানা কত শত গাছ-গাছালির উল্লেখ করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের সঙ্গে সঙ্গে রূপকথা, পুরাণের জগৎও চিত্ররূপময় হয়ে উঠেছে তাঁর কবিতায়, যা আজও কবিতাপ্রেমী বাঙালিকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছে। 
—দিবিয়া ঘোষ  একাদশ শ্রেণি

কিশোর মনে সত্যজিৎ
 সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি সত্যজিৎ রায় আমাদের মতো কিশোরদের কাছে এক চিরন্তন বিস্ময়। তাঁর সৃষ্টির প্রধান বৈশিষ্ট্য হল ভাষায় সরলতা, চিন্তার গভীরতা ও মানবিক গুণাবলির অনন্য প্রতিফলন। ফেলুদার মগজাস্ত্রের রহস্য থেকে শুরু করে প্রফেসর শঙ্কুর রোমাঞ্চকর কল্পবিজ্ঞান— তাঁর প্রতিটি রচনা আমাদের চিন্তাশক্তিকে শাণিত করে এবং কল্পনার জগৎকে প্রসারিত করে। কলমের পাশাপাশি তাঁর ক্যামেরার জাদুও আমাদের মনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। বিশেষ করে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত ‘পথের পাঁচালি’, ‘অপরাজিত’ ও ‘অপুর সংসার’-এর মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রগুলি আমাদের সামাজিক সচেতনতা ও নৈতিক মূল্যবোধের পাঠ দেয়। জীবনকে নতুন করে চেনার পথপ্রদর্শক হলেন সত্যজিৎ রায়।
—রচনা বিশ্বাস  দশম শ্রেণি

স্বাধীনতার পথ সশস্ত্র সংগ্রাম
 শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবি’ উপন্যাসটি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পটভূমিকায় রচিত। যা প্রখর স্বদেশ চেতনা ও বৈপ্লবিক মতাদর্শের ধারক। সব্যসাচীর চরিত্রের মাধ্যমে তিনি পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের পথ নির্দেশ করেছেন। দেশপ্রেম ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বক্তব্যের কারণে ‘পথের দাবি’ উপন্যাসটি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়েছিল। এই উপন্যাসে লেখক অহিংসার তুলনায় সশস্ত্র সংগ্রামের পথটিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ‘পথের দাবি’ শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতা নয়, তার সঙ্গে ন্যায়বিচার, সাম্য ও শোষণহীন সমাজ গড়ার পথের সন্ধান দেয়। সেই সময় ভারতীয় পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক দেশপ্রেমের প্রেরণা ছিল শরৎচন্দ্রের এই উপন্যাস।
—রূপায়ণ চট্টোপাধ্যায়  দশম শ্রেণি

প্রধান শিক্ষকের কলমে

জৌগ্রাম হাই স্কুল

পূর্ব বর্ধমান জেলার জামালপুর থানার অন্তর্গত একটি সুন্দর গ্রাম জৌগ্রাম। এটি একটি প্রাচীন সমৃদ্ধশালী জনপদ। এখানকার চলার পথে লুকিয়ে আছে বহু অজানা ইতিহাস। তারই মধ্যে অন্যতম বিদ্যাসাগরের আশীর্বাদ ধন্য ১৭৫ বছরের বিদ্যালয়— জৌগ্রাম হাই স্কুল।
ব্রিটিশ আমলে কীভাবে তৈরি হল এই স্কুল, জেনে নেওয়া যাক। শোনা যায়, একসময় জৌগ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যেত দামোদর নদের শাখা ঋজুকুলা নদী। তাই নদী পথেই এই গ্রামের সঙ্গে কলকাতার ব্যবসা বাণিজ্য চলত। চিন্তা-ভাবনা ও সংস্কৃতির আদানপ্রদান হত। জৌগ্রামে তখন প্রভাবশালী উচ্চবর্ণের মানুষজনের বসবাস। কলকাতায় তখন নারীশিক্ষার নতুন দিগন্ত রচিত হচ্ছে। ১৮৪৯ সালে তৈরি হয়েছে বেথুন স্কুল। ১৮৫০ সালে তারই প্রভাব পড়েছিল জৌগ্রামে। বাবু নবকুমার মজুমদারের বসতবাড়িতে প্রতিষ্ঠা হল বালিকা বিদ্যালয়। শিক্ষাব্রতী মানুষজনের হাত ধরে এগিয়ে চলল বিদ্যালয়। বাড়তে লাগল ছাত্রী সংখ্যা।
বালিকাদের এই স্কুলের কথা জানতে পারলেন স্বয়ং বিদ্যাসাগর মশাই। তখন তিনি দক্ষিণ বাংলার স্কুল পরিদর্শক। ১৮৫৫ সালের ২৭ মে জৌগ্রামে এসে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন। পরবর্তীতে অনুদান ও অনুমোদনের ব্যবস্থা করেন। তাই এখানকার মানুষজন স্কুলের প্রতিষ্ঠাপুরুষ হিসেবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকেই ভাবেন। কালের নিয়মে গ্রামের মানুষের দান করা জমি ও অর্থে গড়ে ওঠে নিজস্ব বিদ্যালয়।
১৯৪১ সালের আগে মিডল ইংলিশ স্কুল, ১৯৫৩ সালে জুনিয়র হাই স্কুলে উন্নীত এবং কো-এডুকেশন চালু হয়। ১৯৬৬ সালে হাই স্কুল এবং ২০১৫ সালে কলা ও বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে এই স্কুল উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে উন্নীত হয়।
ঝা-চকচকে স্কুল প্রাঙ্গণ। বর্তমানে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ১২০০। রেজাল্টও বেশ ভালো। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলো, নাট্যচর্চা, পুতুলনাচ, অন্যান্য সংস্কৃতি চর্চায় এখানকার পড়ুয়ারা যথেষ্ট পারদর্শী। রয়েছে জেলা থেকে জাতীয়স্তরের বহু পুরস্কার। একাদশ শ্রেণির কলাবিভাগের ছাত্র চন্দন সরকার মণিপুরে আয়োজিত স্কুলস্তরের জাতীয় মার্শাল আর্ট প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জ পদক লাভ করে। স্কুলকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছেন শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মী ও অভিভাবকদের মিলিত প্রচেষ্টা। রয়েছেন তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বর্ষীয়ান প্রাক্তনীরা।
১৭৫ বছরের স্কুলকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন অনেক কিছুর। দরকার স্মার্ট ক্লাসরুম সহ খেলার মাঠ। সৌরবিদ্যুৎ সংরক্ষণের জন্য চাই আরও অর্থ। চাই পরিকাঠামোগত উন্নয়ন। শিক্ষকদের সংখ্যাও কম। আশা করি, বিদ্যাসাগরের আশীর্বাদধন্য এই স্কুল আরও এগিয়ে যাবে।
— তপনকুমার রাউত 
(প্রধান শিক্ষক)

 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ