অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: কৃষক ও রাইস মিল মালিকদের সংঘাত মেটাতে এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি (এআই)-এর দ্বারস্থ রাজ্য সরকার। এতদিন সিপিসিগুলিতে সরকারি নায্যমূল্যে ধান কেনার সময় গোলমাল বাধত। দু’পক্ষই জড়িয়ে পড়তেন সংঘাতে। মূলত, ধানের গুণমান নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাইসমিল মালিকরা কৃষকদের বিপাকে ফেলে দিতেন বলে অভিযোগ। চূড়ান্ত হয়রানির শিকার হতেন তাঁরা। এবার সেই সমস্যার মোকাবিলা করবে এআই। ধানের গুণগতমান পরীক্ষা করার পুরো প্রক্রিয়াটি সামলাবে এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। আরও সহজ করে বললে, সিপিসি বা মাণ্ডিতে কোন ধান গ্রহণ করা হবে আর কোন ধান বাতিল করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেবে এআই যন্ত্র। মিল বা ক্রয়কেন্দ্রের কর্মীদের ধানের ভালো-মন্দ বিচার করার আর কোনো এক্তিয়ার থাকছে না। প্রাথমিকভাবে ১০০টি এআই যন্ত্র কিনে নদীয়া সহ ১০টি জেলায় পাইলট প্রজেক্ট গ্রহণ করেছে খাদ্যদপ্তর। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি জেলার সব সিপিসিকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানা গিয়েছে।
খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া রবিবার বলেন, ‘আগের সরকারের সময় চাষিরা ওজন ও গুণগতমান নিয়ে মাণ্ডিতে গেলে হয়রানির শিকার হতেন। আমরা সরকারে এসে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মাণ্ডিতে এআই যন্ত্র থাকবে। সেই যন্ত্রই ধানের গুণগতমান বিচার করবে। এতে চাষিরা ধান বিক্রি করতে গিয়ে আর হয়রানির শিকার হবেন না।’ কীভাবে কাজ করবে এআই? যন্ত্রটির প্রযুক্তিগত নাম ‘অটোমেটিক ফুড গ্রেইম অ্যানালাইজার’। যন্ত্রে ধানের নমুনা দিলেই তিন মিনিটের মধ্যে স্ক্যান করে গুণমান সংক্রান্ত রিপোর্ট জানিয়ে দেবে। ধানের দানা একটির উপর আরেকটি পড়ে থাকলেও সেগুলিকে পৃথকভাবে শনাক্ত করারও ব্যবস্থা রয়েছে। ধানের আর্দ্রতার পরিমাণ, অপুষ্ট ও ভাঙা দানা, পোকায় খাওয়া দানা, অঙ্কুর অন্য ফসলের দানা, পাথর কিংবা ধুলোর উপস্থিতি রয়েছে কি না সেটাই জানিয়ে দেবে এআই। নমুনা বাতিল হলে তার কারণ সহ সবিস্তার ব্যাখ্যাও মিলবে ডিজিটাল রিপোর্টে। ফলে ধানের মান নিয়ে কারচুপি ও চাষিদের হয়রানি কমবে বলে মনে করছে প্রশাসন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ খরিফ মরশুমে রাজ্যে ৩১২২টি ধান ক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে ২৭ লক্ষেরও বেশি কৃষকের কাছ থেকে ৪৮ লক্ষ মেট্রিক টনের বেশি ধান সংগ্রহ করা হয়েছিল। ধানের গুণগতমানের প্রশ্নে বিক্ষিপ্ত গোলামাল হয়েছে। একাধিক সেন্ট্রাল প্রোকিওরমেন্ট সেন্টার বা সিপিসিতে ধান নিয়ে গেলে গুণগতমানের অজুহাতে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। চাষিদের একাংশ জানিয়েছে, রাইস মিল বা ক্রয়কেন্দ্রের কর্মীদের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে অনেক সময় ভালো ধানও বাতিল করা হয়। আবার নিম্নমানের ধান সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থায় ঢোকানোর অভিযোগও রয়েছে ফড়েদের বিরুদ্ধে। এবার ধানের গুণমান যাচাইয়ে প্রক্রিয়া এআই নির্ভর হলে দীর্ঘদিনের এই ঝামেলা আর থাকবে না বলে মনে করা হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গ রাইস মিল অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক মনোজ ফোগলা বলেন, ‘আমাদের এটা দাবি ছিল। ওড়িশা রাজ্যে এই অ্যানালাইজার যন্ত্র দিয়ে ধানের গুণমান যাচাই করা হচ্ছে। সরকার তাতে মান্যতা দিয়েছে।’ খাদ্যদপ্তর সূত্রে খবর, ১০০টি যন্ত্র কেনা, বসানো এবং রক্ষণাবেক্ষণে ইতিমধ্যেই টেন্ডার ডাকা হয়েছে। নদিয়া, বীরভূম, হুগলি এবং পূর্ব বর্ধমানে ছ'টি করে যন্ত্র বসানো হবে। পূর্ব মেদিনীপুরে আটটি এবং মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগনা, পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় সাতটি করে যন্ত্র বরাদ্দ করা হয়েছে।



