নিজস্ব প্রতিনিধি ও সংবাদদাতা: নাম-প্রতীকের জন্য দুই গোষ্ঠীর খেয়োখেয়িতে আপাতত ‘নখ-দন্তহীন’ রাজ্যের গত ১৫ বছরের শাসকদল। সে কারণে নির্বাচনি লড়াইয়ের ঝাঁঝ একলপ্তে যেন অনেকটাই কম। তবুও নন্দীগ্রাম আর রেজিনগর কেন্দ্রে উপনির্বাচনের প্রাক্কালে নাটক অব্যাহত। বিরোধীদের অভিযোগ, আগ্রাসন দেখাতে গিয়ে বাংলার এই দুই আসনে আসন্ন উপনির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছে বিজেপি। ১৯ বছরের পুরানো তিন মামলায় নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান শনিবার থেকে ১৪ দিনের জেল হেপাজতে। অপরদিকে, নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করেছিলেন রেজিনগরে মমতার ‘ফুটবলার’ রবিউল আলম চৌধুরি। তার মাত্র দেড়ঘণ্টা পরই ঘোষণা করলেন—‘নেত্রীর পরামর্শ মেনে থাকছি লড়াইয়ে ময়দানে।’
শুক্রবার গভীর রাত পর্যন্ত চলা বিস্তর টানাপোড়নের পর পুলিশ শনিবার আদালতে হাজির করায় মিলন প্রধানকে। নন্দীগ্রাম আন্দোলন পর্বে তিনটি মামলায় হলদিয়া আদালত মিলনবাবুকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত জেল হেপাজতে পাঠিয়েছে। ওইদিন জামিন না মিললে, কারাগারের অন্তরাল থেকে ৬ অক্টোবরের ভোটযুদ্ধে শামিল হতে হবে ‘হাত’ প্রার্থীকে। এই পরিস্থিতিতে রাহুল গান্ধী থেকে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে, যেভাবে মিলনবাবুর সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন, তাতে ফলাফল যাই হোক না কেন, নন্দীগ্রাম থেকেই কংগ্রেস মূল বিরোধী হওয়ার লড়াই শুরু করতে চলেছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের আবেদন—‘বিজেপির ষড়যন্ত্রে মিলন জেল হেপাজতে। প্রচারে তাঁকে দেখতে পাবেন না। আমাদের পোস্টার-হোর্ডিংও হয়তো ছিড়ে ফেলা হবে। বিজেপির এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে নন্দীগ্রামবাসী, ঘরে ঘরে মিলন প্রধান হয়ে উঠুন।’ এই পর্বেই নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাঁথি থানার পুরানো একটি মামলা সামনে এসেছে। ‘শোন অ্যারেস্ট’ দেখিয়ে কাল, সোমবার কাঁথি আদালতে তোলা হবে তাঁকে। শুক্রবার মিলনবাবুর সঙ্গেই পুলিশ পাকড়াও করেছিল প্রদেশ কংগ্রেসের পর্যবেক্ষক শুভাশিস ভট্টাচার্যকে। রাতে চণ্ডীপুর থানায় গিয়ে তাঁকে পার্সোনাল বন্ডে মুক্ত করান প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি। শুভাশিসের কথায়, ‘মিলন এবং আমাকে চোখে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মন্দারমনির এক রিসর্টে। প্রার্থিপদ প্রত্যাহারের জন্য প্রবল চাপ দেওয়া হয়। আমরা বলেছিলাম, ইউএপিএ ধারায় মামলা দিলেও, প্রত্যাহার করব না।’
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর আশীর্বাদ নেওয়ার পরের দিন শনিবার প্রার্থিপদ প্রত্যাহার করেছিলেন নন্দীগ্রামে ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে। তারপরই সাংবাদিক বৈঠক করে কংগ্রেসকে সমর্থন দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অপরদিকে রেজিনগরের লড়াই থেকে রবিউলকে সরে আসার পরামর্শও দেওয়া হয়। এদিন বেলা ১১টা নাগাদ সাংবাদিকদের প্রাক্তন বিধায়ক রবিউল বলেন, ‘এত কম সময়ের মধ্যে নতুন প্রতীক মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছানো এবং চেনানো অসম্ভব। তাছাড়া দলীয় কর্মীদের উপর ক্রমাগত চাপ বাড়ানো হচ্ছে। বহু কর্মীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করছে। এমন থমথমে পরিবেশে নির্বাচন লড়ব কীভাবে! তাই সরে দাঁড়াচ্ছি।’ দেড় ঘণ্টা পর ফের সাংবাদিকদের সামনে আসেন। হাসিমুখে জানান, ‘দিদির নির্দেশে প্রার্থিপদ বহাল রাখছি। ময়দান ছাড়ছি না। ১০ জন কর্মী নিয়ে হলেও, লড়াই করব।
অপরদিকে বিধানসভা ভোটের দিন গোলমাল, মারধর ও ভাঙচুরের অভিযোগে রেজিনগরের এক নির্দল প্রার্থীকে নওদা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নাম সইফুল ইসলাম ওরফে মদন। হুমায়ুন কবিরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টির ডামি প্রার্থী হিসাবে তিনি পরিচিত স্থানীয় এলাকায়। এরই পাশাপাশি শুক্রবার রাতে হরিহরপাড়া থেকে ৫০০ টাকার শতাধিক জাল নোট ও বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র সহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে হুমায়ুনের পার্টির রাজ্য সম্পাদক আশিক ইকবালকে। অপরদিকে চর্চিত অডিও কাণ্ডে হুমায়ুনকে হাজিরার নোটিস দিয়েছে বহরমপুর থানার পুলিশ। সোমবার হাজিরা দিতে হবে তাঁকে।
উপনির্বাচনের দিন যত এগচ্ছে পরতে পরতে বিস্ময় উন্মোচিত হচ্ছে। রেজিনগরের বর্তমান বিধায়ক হুমায়ুন কবির গত বিধানসভা ভোটে জিতেছিলেন ‘বাঁশি’ প্রতীকে। কিন্তু কমিশনের নির্দেশে তাঁর ছেলে তথা প্রার্থী গুলাম নবি আজাদকে লড়তে হবে ‘টেবিল’ প্রতীকে। নিবন্ধীকৃত রাজনৈতিক দল হয়েছে সভাপতি বিধায়ক অরূপ রায়ের গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস। প্রতীক ‘খাম’। কিন্তু আইএসএফের টানা দু’বারের বিধায়ক নৌশাদ সিদ্দিকি ভাঙড় থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন এই ‘খাম’ প্রতীকেই। এবার কমিশন তা কেড়ে নিয়ে দিয়েছে ‘আলমারি’ প্রতীক। তাই নন্দীগ্রামে ভোটযুদ্ধে আইএসএফ প্রার্থীর হাতিয়ার পাল্লাবন্ধ ‘আলমারি’ই।