


সুখেন্দু পাল, রায়না: দামোদরে এখন জল কম। বসন্তের দুপুরে হালকা হাওয়া বইছে। নদীর এপারে সবজির জমি। তার ঠিক পাশেই ছাতা নিয়ে বসেছিলেন দুলাল দাস। বর্ধমান থেকে সাইকেল চালিয়ে ফেরার পথে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন। হিজলনায় যাবেন। এই সেই হিজলনা, বাম আমলে যে গ্রামে লাল পতাকা ছাড়া আর কিছুই দেখা যেত না। কথায় রয়েছে, হিজলনা পঞ্চায়েত যার, রায়না বিধানসভাও তার। তবে, শুধু রায়না নয়, দামোদরের পাড়ে থাকা খণ্ডঘোষ, গলসি, জামালপুরও ছিল বামেদের খাসতালুক।
১০বার রায়না বিধানসভা কেন্দ্রে বামেরা জয়ী হয়েছে। পাশের বিধানসভা কেন্দ্রেও ১৯৭১ সাল থেকে দাপট দেখিয়ে এসেছে বামেরা। সেই লালদুর্গ অবশ্য পরে তৃণমূলের দখলে যায়। অবশিষ্ট থাকা বামেদের ভোট ব্যাংকের অনেকটাই বিজেপির দিকে ঝুঁকতে থাকে। জেলার তাবড় বামনেতাদের জন্ম দক্ষিণ দামোদরে। তারপরও বামেরা রামের দিকে ঝুঁকতে থাকায় দলের অন্দরেই প্রশ্ন উঠছিল। তবে, এবারের নির্বাচনে সেই ছবিটা বদলাতে চলেছে। এমনটাই বলছিলেন ছাতা মাথায় দামোদরের পাড়ে বসে থাকা ৬৯ বছরের ওই বৃদ্ধ। তিনি বলেন, এক সময় আমরা সিপিএম করতাম। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর আর সক্রিয়ভাবে দল করিনি। তবে, আমাদের পরিবারের ছেলেমেয়েরা বিজেপির দিকে ঝুঁকতে থাকে। এবার দেখলাম তাঁদের মনোভাব বদলাচ্ছে। তাঁরা বিজেপির সমালোচনা করছে। এর কৃতীত্ব অবশ্য দলের স্থানীয় নেতাদের দিতে হবে। তারা প্রবল বাধা অতিক্রম করে বৈঠক করেছেন। পাড়ায় গিয়ে চাটাইয়ে বসে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাছাড়া মানুষও বাস্তব অভিজ্ঞতায় বুঝেছে।
মাঝখাণ্ডায় বসে কথা হচ্ছিল আর এক মাঝবয়সি ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি বলেন, রায়নায় পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে থেকেই বামেদের ভোট ফিরতে শুরু করেছে। সেই কারণে এই এলাকায় শাসক দলকে প্রবল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছিল। তারপরও রায়না, গলসি বিধানসভা কেন্দ্রর বেশকিছু এলাকায় পঞ্চায়েত নির্বাচনে সাফল্য এসেছে। জামালপুরের সিপিএম প্রার্থী সমর হাজরা বলেন, আমরা ময়দান থেকে সরিনি। যাঁরা ভুল বুঝে গিয়েছিলেন, তাঁরা ফিরছেন। কেন্দ্র প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছে। কর্মসংস্থান নেই। মানুষ বিচার বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জামালপুর বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি ৩৮.২৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। সিপিএমের ভোট ১১.২৭ শতাংশে নেমে আসে। তৃণমূল ভোট পায় ৪৬.৯৩ শতাংশ। বামেরা ভোট বাড়াতে পারলে শুধু জামালপুর নয়, দামোদরের পাড়ে থাকা চারটি বিধানসভা কেন্দ্রেই বিজেপিকে আরও ব্যাকফুটে যেতে হবে বলে রাজনৈতিক মহলের মত। চারটি বিধানসভা কেন্দ্রই তৃণমূলের দখলে রয়েছে। লোকসভা নির্বাচনের নিরিখেও তারা এগিয়ে আছে। জামালপুর ব্লকের তৃণমূলের সভাপতি মেহেমুদ খান বলেন, মানুষ তৃণমূল ছাড়া অন্য কোনো দলের কথা চিন্তা করে না। বিজেপি নেতা প্রধানচন্দ্র পাল বলেন, সিপিএমের পাশাপাশি তৃণমূলের সমর্থকরাও আমাদের ভোট দেবেন।
দামোদরের পাড়ে রোদের তাপ বাড়ছে। দুপুরে আর তেমন লোকজন নেই। ফেরার পথে শুধুই উড়ছে তেরঙা পতাকা। প্রচারে বাম প্রার্থী।