সংবাদদাতা, কাটোয়া: খুনের দেড় বছরের মধ্যেই সাজা ঘোষণা করল কাটোয়া ফাস্ট ট্র্যাক আদালত। ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর কেতুগ্রামের কোমরপুরে চলন্ত যাত্রীবাহী বাসের মধ্যেই অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী আরশিদা খাতুন (১৪)’কে নৃশংসভাবে গলা কেটে খুন করে প্রেমিক ইজাজুল শেখ ওরফে বাবু। শুক্রবার সেই প্রেমিককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিল কাটোয়া আদালত। একই সঙ্গে ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। অনাদায়ে অতিরিক্ত এক বছরের জেলে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
আদালতের রায় শুনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মৃত ছাত্রীর মা ঝর্ণা বিবি ও বাবা আরশেদ শেখ৷ দু’জনেই বলেন, ‘বিচার পেয়ে একটু স্বস্তি পাচ্ছি। কিন্তু, মেয়ে হারানোর যন্ত্রণা আমাদের আমৃত্য বয়ে বেড়াতে হবে। আর কোনো বাবা-মায়ের কোল যেন এভাবে খালি না করা হয়।
কাটোয়ার হরিপুর গ্রামের বাসিন্দা আরশেদ শেখের দুই মেয়ে। বড় মেয়ে ছিল আরশিদা। তাকে প্রতিদিন উত্যক্ত করত প্রতিবেশি যুবক ইজাজুল। ঘটনার দিন আরশিদা তার মাসি শম্পা বিবির সঙ্গে কান্দরা থেকে বাসে আরনা গ্রামে ফিরছিল। সঙ্গে ছিল শম্পা বিবির ছোটো ছেলে। কেতুগ্রাম-১ ব্লক অফিসে কিছু কাজের জন্য গিয়েছিলেন তাঁরা। সাড়ে বারোটা নাগাদ কুচুটিয়া-কাটোয়া বাসে চাপেন তিনজন। ইজাজুল কোমরপুরেই বাসে ওঠে। বাসের প্রথম দরজার প্রথম সিটে জানালার ধারে বসেছিল আরশিদা। পাশে বসেছিলেন শম্পা বিবি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হরিপুর গ্রামের যুবক ইজাজুল ধারাল ছুরি নিয়ে আরশিদার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছুরি নিয়ে গলায় আঘাত করে। তার পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে কেটে দেয় গলার নলি। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। মাসি বাধা দিতে গেলে ধাক্কা মেরে ফেলে দেওয়া হয়। আরশিদা বাসের মধ্যেই লুটিয়ে পড়ে। দৌড়ে পালিয়ে যায় ইজাজুল। আরশিদাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত বলে ঘোষণা করেন। ওই দিন শম্পা বিবি কেতুগ্রাম থানায় ইজাজুলের নামে লিখিতভাবে খুনের অভিযোগ জানিয়েছিলেন। সেদিন বিকালেই কোমরপুরে একটি জঙ্গলে ড্রোন উড়িয়ে ইজাজুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
ঘটনার তিন মাসের মধ্যেই ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর পুলিশ তদন্ত করে মামলার চার্জশিট দেয়। কাটোয়া মহকুমা ফার্স্ট ট্র্যাক কোর্টে ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মামলার চার্জ গঠিত হয়। বাসের চালক, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলাকারী শম্পা বিবি সহ মোট ৩৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে আদালত। বৃহস্পতিবারই ইজাজুলকে দোষীসাব্যস্ত করা হয়। এদিন যাবজ্জীবন সাজা ঘোষণা করেন বিচারক।
সরকারি আইনজীবী ইমরান কাশেম এদিন বলেন, ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা লাগু হওয়ার পর কাটোয়া মহকুমা আদালতে এটাই প্রথম সাজা। বিচারক রুদ্রপ্রসাদ রায় মামলাটি বিরলের থেকেও বিরলতম আখ্যা দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন। ওই ছেলেটি কাটোয়া শহরের বাসস্ট্যাণ্ডে ট্রাফিক মোড় থেকে সেদিন ধারাল চাকু কিনেছিল৷ মামলা চলাকালীন ওই দোকানদারেরও সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল।’ এদিন সাজা শুনেই মামলাকারী অর্থাৎ আরশিদার মাসি বলেন, ‘ওই ছেলেটি আমার বোনের মেয়েকে খুব উত্যক্ত করত। প্রেমের প্রস্তাব দিত। সেই প্রস্তাবে আরশিদা সায় দেয়নি। তাকে আমাদের কাছে আশ্রয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু, তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। নৃশংস ভাবে খুন হতে হয়েছে আরশিদাকে। আদালতের রায়ে আমরা খুশি। তবে, ছেলেটির ফাঁসির সাজা হলে আরও বেশি খুশি হতাম।
যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামী ইজাজুল শেখ ওরফে বাবু। কাটোয়া আদালতে তোলা নিজস্ব চিত্র