


বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: এখন দেশে ধ্যান, জ্ঞান, চিন্তামণি কি একটাই— ঝড়ের গতিতে ভুঁড়ি কমানো? না হলে কীভাবে মাত্র ১ বছর ২ মাসে দেশের বাজারে আসা একটি মেডিসিন ওষুধশিল্প মহলে ইতিহাস তৈরি করল? ভুঁড়ি কমানো ও ডায়াবেটিস কন্ট্রোলের ‘গ্লুকাগন লাইক পেপটাইড ১’ বা ‘জিএলপি ১’-এর অন্যতম ওষুধ হল টিরজেপেটাইড। এক বহুজাতিক সংস্থার এই জেনেরিক নামের ওষুধই তোলপাড় ফেলেছে সর্বত্র। কারণ, ৬ মাসে ৫ থেকে ১০ শতাংশ এবং এক বছরে ১০ থেকে ২০ শতাংশ দেহের ওজন কমিয়ে দেয় বলে দাবি এই ওষুধের প্রস্তুতকারক সংস্থার। এই ওষুধ নিয়ে কম বিতর্ক দানা বাঁধেনি।
নির্মাতা সংস্থা ওষুধের বিক্রি বাড়াতে দেশজুড়ে ভুঁড়ি কমানো নিয়ে প্রচার শুরু করেছিল। তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়। শেষে প্রচার বন্ধ করে দেয় সরকার। এমনকি, প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধটি বাজারে বিক্রি হচ্ছিল বলে অভিযোগ। তারপরই দিল্লি হাইকোর্ট এবং ওষুধ সংক্রান্ত শীর্ষ সংস্থা সিডিএসিও কড়া পদক্ষেপ নেয়। সম্প্রতি গুরুগ্রামে লক্ষ লক্ষ টাকার জাল ওষুধও ধরা পড়ে।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের মার্চে ভারতের বাজারে এসেছে ওষুধটি। ৬ মাসের মধ্যে এটি টাকার অঙ্কে সর্বাধিক বিক্রি হওয়া ওষুধে পরিণত হয়। তারপর থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো ওষুধ কোম্পানির কোনো ওষুধ একে স্থানচ্যুত করতে পারেনি। বিভিন্ন বয়সের মানুষের কাছে ‘ক্রেজ’-এ পরিণত হওয়া এই ওষুধ সম্পর্কে কী বলছে ইন্ডিয়ান ফার্মা ইন্ডাস্ট্রির পারফরম্যান্স রিপোর্ট? তারা বলছে, শুধু এপ্রিল মাসেই সারা দেশে ১০২ কোটি টাকার ব্যবসা করেছে এই ওষুধ। এই গতিতে চললে বছরে শুধু এই ওষুধের বিক্রি দাঁড়াবে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি! তাও আবার এই ওষুধের সঙ্গে টক্কর নেওয়ার মতো তুলনায় অনেকটাই সস্তা একাধিক জেনেরিক ওষুধ বাজারে আসার পরেও!
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সেপ্টেম্বরে ৮০ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ১৩৫ কোটি, মার্চে প্রতিযোগীরা আসার পর একটু কমে ১১৪ কোটি, এপ্রিলে ১০২ কোটি— কমবেশি গড়ে মাসে ১০০ কোটি টাকার বেশি ব্যবসা করে যাচ্ছে এই ওষুধ। চিকিৎসকরা অবশ্য বলছেন, ওই ওষুধ বেশ কার্যকর হলেও দাম কম নয় মোটেই। ৫ মিলিগ্রাম থেকে ১৫ মিলিগ্রাম ডোজে সপ্তাহে একটি করে ইঞ্জেকশন নিলে মাসে খরচ কমবেশি ২২ থেকে ২৭ হাজার টাকা। এন্ডোক্রিনোলজিস্ট, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং কার্ডিওলজিস্টদের পরামর্শ এবং তত্ত্বাবধান ছাড়া এই ওষুধটি প্রেসক্রাইব করা যায় না। এমনটাই জানিয়েছেন রাজ্যের খ্যাতনামা এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডাঃ সতীনাথ মুখোপাধ্যায়। সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, নিজের মতো এটি খেলে প্যানক্রিয়াটাইটিস, চুল পড়ে যাওয়া, ডায়ারিয়া, বমি সহ নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। অন্য এক ধরনের জিএলপি-১ ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বিদেশে অন্ধত্বের ঘটনাও ঘটেছে। তাই রোগা হওয়ার তাড়নায় অনলাইনে দেখে স্বচিকিৎসা করলে ঘোর বিপদ!
ওষুধের দোকানিদের অন্যতম সংগঠন অল ইন্ডিয়া কেমিস্ট অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউটর্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক জয়দীপ সরকার বলেন, ওষুধটি নিয়ম মেনে বিক্রি হচ্ছে কি না, তা জানতে ড্রাগ কন্ট্রোলের সতর্ক থাকা উচিত। প্রেসক্রিপশন অডিটও জরুরি।