সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: যে কোনো রাজনগরীর বৈভব প্রদর্শনের প্রধান বাধা হল, দারিদ্র এবং আর্থিক বৈষম্য। উদাহরণ? বস্তি, আবর্জনা, ভিক্ষুক এবং গৃহহীনদের প্রকাশ্য উপস্থিতি। সেই সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়ার ফরমুলা এবং স্লোগান সত্যজিৎ রায় শাসকদের অনেক আগেই উপহার দিয়ে গিয়েছেন ‘হীরক রাজার দেশে’। উৎসব উপলক্ষ্যে হীরকরাজ প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে বলেছিলেন—‘নগররক্ষার কাজে যত বরকন্দাজ, তাদের প্রধান কাজ, রাজপথের ধারেকাছে দারিদ্রের যত চিহ্ন আছে, সব দূর করা।’ মন্ত্রী হীরকরাজকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ‘সে তো করবেই মহারাজ। নগররক্ষার কাজে নগরে যা কিছু দৃষ্টিকটু, সবকিছু মুছে দিতে, পেয়াদারা যথেষ্ট পটু।’ হীরকরাজ বলেছিলেন, ‘প্রথম দর্শনে বাইরের কারও মনে সন্দেহের উদয়, মোটে বাঞ্ছনীয় নয়’। দশকের পর দশক ধরে সেই স্লোগানই অনুসরণ হচ্ছে বিশ্বের সর্বত্র।
দিল্লির কেন্দ্রস্থলে আজ থেকে হাই ভোল্টেজ ব্রিকস সম্মেলন। রাশিয়া থেকে চীন। ইরান, ব্রাজিল, সৌদি আরব, মিশর। তাবৎ রাষ্ট্রপ্রধানদের উপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পাওয়ার করিডরে পর্যবসিত হয়েছে দিল্লি। মৌর্য শেরাটন, তাজ প্যালেস, হোটেল ললিত, লা মেরিডিয়ান, ম্যারিয়ট সহ ৩৫টি হোটেলে বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রনায়করা থাকছেন। দিল্লি ও সংলগ্ন নয়ডার পাঁচ এয়ারপোর্টে নামছে অসংখ্য ভিভিআইপি বিমান। ভ্লাদিমির পুতিন-জি জিনপিং নিজেদের গাড়িও এনেছেন। সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ কেটারিং সার্ভিস। বাইরের বাটলার বা শেফের তৈরি খাদ্য জিনপিং-পুতিন পোছেন না।
লুটিয়েন্স দিল্লি তাই যেন দৃশ্যত স্বপ্ননগরী। কিন্তু এই আলোর আড়ালে সুচারুভাবে ঢেকে দেওয়া হয়েছে অন্য রাজধানীকে। শপিং সেন্টার জনপথ মার্কেট বৃহস্পতিবার থেকে খাঁ খাঁ করছে। কারণ গয়না, পোশাক, পুতুলের সম্ভার নিয়ে ৩৬৫ দিন বসা বিক্রেতাদের দিল্লি পুলিশ জানিয়ে দিয়েছে, রবিবার পর্যন্ত সব বন্ধ। লুটিয়েন্স দিল্লি হল অফিসপাড়া। বিক্রেতা এবং হকারদের স্বর্গভূমি। কিন্তু চারদিন ধরে রুজি রোজগার বন্ধ। সফদরজং, অরবিন্দ মার্গ, ভৈঁরো মার্গ, পুরানো কেল্লা রোডে এত হাই গ্রিন ক্যানভাস কার্টেন আর মেটাল প্যানেল কেন? অস্থায়ী বাসস্থান, নাইট শেলটার, গৃহহারাদের যাতে ভিভিআইপি কনভয় থেকে দেখা না যায়। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেল, যাকে ভিআইপি সিকিওরিটি প্রটোকলে বলা হয়, ক্রিটিকাল গেটওয়ে, তার দু’পাশে বিশাল ব্রিকস ফ্লেক্স ও ডিজিটাল ডিসপ্লে সিস্টেম। ঠিক আড়ালেই বস্তির ঠিকানা। বৈভবের প্রাচীরে দারিদ্রকে অদৃশ্য করার প্রয়াস। কিন্তু কেন্দ্রকে বিপদে ফেলেছে বৃষ্টির সম্ভাবনা। দু’দিন প্রবল বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর। রেড অ্যালার্ট। এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই দিল্লি জলমগ্ন হয়। ব্রিকসের সামনে মুখ পুড়বে না তো!
শাহি দিল্লি, ব্রিটিশ দিল্লি এবং আধুনিক দিল্লির কেন্দ্রস্থলের প্রায় সব রাস্তাতেই যানচলাচল নিয়ন্ত্রিত। একমাত্র মেট্রোরেল ছাড়া দিল্লি পুলিশ চায় না, কেউ অন্য পরিবহণ ব্যবহার করুক। আরও ভালো হয় সকলেই ঘরে থাকলে। উপায়ও নেই। তাই সত্যিই দিল্লির বিস্তীর্ণ অংশের মানুষ গৃহবন্দি। কারণ, সিংহভাগ অংশেই অফিস, আদালত, স্কুল, মার্কেট বন্ধ। ভারত মণ্ডপমে যখন ১৬টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, আধিকারিক এবং মিডিয়ায় ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের ঔজ্জ্বল্যের ঠিক উলটোদিকে অবস্থিত পুরানো কেল্লা, হুমায়ুনের লাইব্রেরি, শের শাহের স্থাপত্য এবং সবুজ বাগান... এই প্রথম সম্পূর্ণ নির্জন। এখন আম জনতার প্রবেশ নিষেধ!