


ভারতীয় নারীদের হাল নিয়ে বহির্ভারতে যে চর্চাই হোক না কেন, এদেশের নির্বাচনি রাজনীতির কেন্দ্রে এখন তাঁরাই। বলা বাহুল্য, ভারতের মহিলারা ভোটের লাইনে বেশি সংখ্যায় দাঁড়াবার পর থেকেই তাঁদের কদর একধাক্কায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক অতীতে দেশের কয়েকটি রাজ্যে ভোটদানের নিরিখে তাঁরা পুরুষদের পিছনে ফেলে দিয়েছেন। লোকসভা/বিধানসভার কোনো কোনো আসনে মহিলা ভোটাররা রীতিমতো নির্ণায়ক শক্তি। প্রার্থী তালিকাতেও মহিলাদের উপস্থিতি ক্রমবর্ধমান। এরপর আইনসভায় তাঁদের জন্য আসন সংরক্ষিত হয়ে গেলে নারীশক্তির গুরুত্ব আরো বেড়ে যাবে। সব মিলিয়ে সমস্ত রাজনৈতিক দলই মহিলা ভোটারদেরকে ‘ত্রাতা’ হিসাবে চিহ্নিত করে ফেলেছেন। কী শাসক, কী বিরোধী উভয়েই ধরে নিচ্ছে, মহিলাদের সমর্থন যেদিকে বেশি বা কম হবে তাদের জয় বা পরাজয়ের সম্ভাবনা বা আশঙ্কা থাকবে তেমনই। তাই মহিলা ভোটারদের মনজয়ের যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে, ভারতের রাজনীতিতে এই জিনিস নিঃসন্দেহে বেনজির।
মহিলা ভোটারদের গুরুত্ব চোখে আঙুল দিয়ে সর্বপ্রথম দেখিয়েছেন বাংলার জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নারীর ক্ষমতায়নের ‘ম্যাজিক’ হিসাবে পশ্চিমবঙ্গে তিনি চালু করেছেন কন্যাশ্রী, রূপশ্রী, সর্বশেষে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। বলা বাহুল্য, প্রকল্পগুলিকে কারো পক্ষেই উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। বরং দেশের অধিকাংশ রাজ্য প্রকল্পগুলিকে অনুকরণ করে ভিন্ন নামে চালু করেছে। কিছু ক্ষেত্রে গ্রহণ করেছে কেন্দ্রের মোদি সরকারও। এছাড়া বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনি ইস্তাহারে মমতার জনমুখী প্রকল্পগুলি নিয়ে যা হয়েছে তা প্রকারান্তরে গণটোকাটুকি! সাম্প্রতিক অতীতে দিল্লি ও বিহার বিজেপি টুকেছে। মোদির পার্টির এবার পালা বাংলায়! মহিলা ভোট হাতাবার মরিয়া চেষ্টায় ‘তিন হাজারি’ টোপ দিল বিজেপি। বিধানসভা নির্বাচনের মুখে আদর্শ আচরণ বিধিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই এই গেরুয়া কীর্তি। ভারতের রাজনীতির আঙিনায় ‘ইস্তাহার’ একটি বহুল প্রচলিত, বহু ব্যবহৃত শব্দ। ২০১৪ এবং ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এই শব্দ ব্যবহার করেই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বিলি করেছিল। হঠাৎ করেই শব্দটি ‘ম্লেচ্ছ’ মনে হয়েছে তাদের। যথারীতি শব্দটি ব্রাত্যও ঘোষিত হয়েছে গেরুয়া আঙিনায়। সৌজন্যে চূড়ান্ত বিভাজন আর মেরুকরণের রাজনীতি। আপত্তিকর ‘ইস্তাহার’-এর শূন্যস্থান দখল করেছে ‘সংকল্পপত্র’। নতুন আমদানি করা শব্দটির গায়ে নিশ্চয় উগ্র হিন্দুত্বের ঝাঁজ খুঁজে পেয়েছেন গেরুয়া রাজনীতির মস্তিষ্কগণ। দিনকয়েক আগে কলকাতায় এই সংকল্পপত্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সাধের গেরুয়া সংকল্পপত্রে বাংলার মহিলাদের প্রতিমাসে তিন হাজার টাকা ভাতা প্রদানের সদর্প ঘোষণা রয়েছে। বুধবার বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন এবং দলের অন্যতম নেত্রী স্মৃতি ইরানিকে দিয়ে তিন হাজারি টোপের ‘মাতৃশক্তি ভরসা কার্ড’ বিলির সূচনাও করিয়েছে বিজেপি। কলকাতায় সাংবাদিক বৈঠক করে স্মৃতি ইরানি পাঁচজন মহিলার হাতে প্রধানমন্ত্রীর ছবি সাঁটা গেরুয়া ফর্ম তুলে দেন। কালনায় দশজন তন্তুবায় মহিলাকে ওই কার্ড বিলি করছেন নির্মলা। এই দুই কর্মসূচি পর্বেই দুর্গাপুর, রানিগঞ্জ, ঝাড়গ্রাম, বনগাঁ, বাগদাসহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ওই কার্ড বিলি শুরু করেছেন পদ্মপার্টির নেতা-কার্যকর্তারা। কোথাও প্রচার করা হয়, আগামী দশদিনেই টাকা মিলবে! আবার কোথাও বলা হয়, ভোট শেষ হলেই মহিলাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট হবে মোদিজির উপহার। মহিলাদের আধার কার্ড, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নম্বর ও ছবি সংগ্রহের কাজও শুরু হয়ে যায়।
রাজ্যে পুরো মাত্রায় চালু রয়েছে নির্বাচনের আদর্শ আচরণ বিধি। এসময় এভাবে ভাতা পাইয়ে দেওয়ার কার্ড বিলি করার প্রক্রিয়া অন্যায়। এই খবর সামনে আসামাত্রই নির্বাচনি প্রচারমঞ্চ থেকেই গর্জে ওঠেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভোটের সময় স্বয়ং কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নিয়ম ভাঙায় তিনি বেজায় ক্ষুব্ধ। এই ঘটনায় ইসিআইয়ের তরফে কঠোর পদক্ষেপ করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। রাজ্যের শাসক দলের পক্ষ থেকেও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে লিখিত অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। তৃণমূলের এই ক্ষোভ ও পদক্ষেপ সংগত। কমিশনের উচিত, অবিলম্বে আইনমাফিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। কমিশন যে স্বচ্ছতা নিরপেক্ষতা জলাঞ্জলি দেয়নি, বিকিয়ে যায়নি মোদি অ্যান্ড কোম্পানির কাছে, সেটারই প্রমাণ দেওয়ার সুযোগ উপস্থিত জ্ঞানেশ কুমারের সামনে। তিনি কি তা গ্রহণের সাহস দেখাবেন? ‘মোদির উপহার’ বিলির বদলে দিল্লিসহ বিভিন্ন জায়গায় মহিলাদের বস্তুত ধোঁকাই দেওয়া হয়েছে। তারপরও বিজেপিকে থামানো কঠিন। কারণ মিথ্যাচার থামাতে যেটুকু ন্যূনতম লজ্জা থাকা দরকার, বিজেপির ভাঁড়ারে তার ছিটেফোঁটাও নেই। বিজেপি লজ্জার ঘাট চেনে না। কেন্দ্রীয় শাসক দলের এই অক্ষমতা দূর করার জন্য যা যা দরকার, আশা করা যায়, বাংলার মানুষ আগামী ২৩ ও ২৯ তারিখ সেসব করবে নিপুণ হাতেই।