অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: নদীয়া জেলার প্রাক্তন কারামন্ত্রী উজ্জ্বল বিশ্বাসের ছত্রছায়ায় একসময় ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল তৃণমূলের একাংশ নেতা-কর্মী। মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়েই ক্ষমতা, প্রভাব ও বৈভবের শিখরে পৌঁছেছিলেন তাঁরা। প্রকাশ্যে নিজেদের ‘মন্ত্রীঘনিষ্ঠ’ পরিচয় দিতেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। কেউ কেউ আবার কয়েকধাপ এগিয়ে ‘অভিভাবক’ও বলতেন। সেই প্রভাবশালী মন্ত্রীর জেলযাত্রা দেখা গেল না এইসব ঘনিষ্ঠ নেতা-নেত্রী এবং স্তাবকদের। টিপ্পনি কেটে জেলাবাসীর একাংশ বলছে, ক্ষমতা হারালে এমনই হয়! রাজনৈতিক মহলের একাংশ অবশ্য বলছে, জনরোষের ভয়েই প্রাক্তন মন্ত্রীর কাছে ঘেঁষতে চাননি কেউই।
মঙ্গলবার সরকারি ত্রাণসামগ্রী—শাড়ি, ত্রিপল সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র অবৈধভাবে মজুত ও পাচারের অভিযোগ ওঠে উজ্জ্বল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে। উত্তেজিত জনতা তাঁর বাড়ির সামনে বিক্ষোভ দেখায়। তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম ছুড়ে মারে। রাতেই বর্ষীয়াণ তৃণমূল নেতাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বুধবার প্রাক্তন মন্ত্রীকে কৃষ্ণনগর আদালতে তোলা হলে বিচারক অশোক হালদার ছ’দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেন।
প্রাক্তন মন্ত্রীর এহেন দুঃসময়ে দলের ঘনিষ্ঠ নেতা-নেত্রীরা সরে গেলে একমাত্র পাশে দাঁড়িয়েছেন মহুয়া মৈত্র। তিনি কৃষ্ণনগর লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল সাংসদ। জেলা রাজনীতিতে উজ্জ্বল-মহুয়ার সংঘাত সর্বজনবিদিত। তা সত্ত্বেও উজ্জ্বলবাবু গ্রেপ্তার হতেই তাঁর হয়ে ব্যাটন ধরেছেন মহুয়া। এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, ‘উজ্জ্বল দা আমাদের দলের মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু, কেন গ্রেপ্তার করা হল, কেউ জানে না। বিধায়ক কোটায় ত্রাণের সামগ্রী দেয় রাজ্য সরকার। সেগুলি আলাদাভাবে রাখার জায়গা থাকে না। তাই গোডাউন বা বাড়িতে রাখা হয়। ৪ তারিখের পর ত্রাণ সামগ্রী ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ আসে মহকুমা ও ব্লক প্রশাসনের তরফে। উজ্জ্বল দা নিজেই প্রশাসনকে চিঠি লিখে ত্রাণসামগ্রী ফিরিয়ে দিতে চেয়েছেন। বিডিও অফিস থেকে গাড়ি এসেছিল সেগুলি নিতে। কিন্তু পুলিশের সামনে বিজেপির লোকজন প্রাক্তন মন্ত্রীকে হেনস্তা করে। এটা কি ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি? এই ঘটনা আসলে অরাজকতা তৈরির নামান্তর।’
দলের অন্দরমহলে উজ্জ্বলবাবুর অন্যতম ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত ছিলেন কৃষ্ণনগর-১ ব্লকের সভাপতি স্বপন ঘোষ। তৃণমূলের একাংশের দাবি, মন্ত্রীর আশীর্বাদেই তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। অথচ, মঙ্গলবার যখন কাঠুরিয়াপাড়ায় উজ্জ্বলবাবুর বাড়ির সামনে জনরোষ আছড়ে পড়লেও তাঁকে দেখা যায়নি। এনিয়ে স্বপনকে ফোন করা হলে মোবাইলের সুইচ অফ। প্রাক্তন মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠদের তালিকায় কৃষ্ণনগর সাংগঠনিক জেলার ছাত্র পরিষদের প্রাক্তন সভাপতি সম্রাট পালের নামও বারবার উঠে আসে। উজ্জ্বলবাবুর ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন একচেটিয়া দাপট দেখানোর অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। কিন্তু, প্রাক্তন মন্ত্রীর দুর্দিনে তাঁকেও প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
কৃষ্ণনগর-২ ব্লক ছিল উজ্জ্বলবাবুর ঘাঁটি। সেখানকার তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর দহরম-মহরম ছিল যথেষ্ট। তাদের একটা অংশও প্রাক্তন মন্ত্রীর পাশে দাঁড়ায়নি। দলের অন্দরে কান পাতলে শোনা যায়, কালীগঞ্জ উপনির্বাচনে আলিফা আহমেদের প্রার্থীপদ নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে সুপারিশ করেছিলেন উজ্জ্বলবাবুই। সেই সময় কালীগঞ্জের প্রাক্তন বিধায়ক ঘনিষ্ঠ বহু কর্মী-সমর্থক নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে মন্ত্রীর শিবিরে ভিড় করেছিলেন। উজ্জ্বলবাবুকে ‘অভিভাবক’ বলতেন। কিন্তু বর্তমান সংকটে সেই মুখগুলিও উধাও। জেলা পরিষদের এক জনপ্রতিনিধিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছিলেন উজ্জ্বলবাবু। তাঁকেও অসময়ে পাশে পাননি তিনি। এদিন আদালতের ধারে কাছেও প্রাক্তন মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠদের কাউকে দেখা যায়নি। বিক্ষোভের ভয়ে উজ্জ্বলবাবুকে সকালে এজলাসে ঢুকিয়ে সন্ধ্যার সময় বের করে পুলিশ। তখনও তেমন কেউ ছিল না। বিপদে পড়লে এভাবেই কাছের লোক সবাই সরে যায়!