Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নিরপেক্ষতার নামে সার্কাস

এই বেশ ভালো। এতদিন ধরে সাংবিধানিক পদের যে মুখোশটা ছিল, সেটা আর থাকল না। তেল কুমার মহাশয় একেবারে খুল্লামখুল্লা তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোপ দেগে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁর কাছে তৈলমর্দন এবং আনুগত্যই শেষ কথা। সাংবিধানিক পদটাকে একেবারে তৃতীয় শ্রেণির প্রাইভেট চাকরির স্তরে নামিয়ে আনলেন তিনি।

নিরপেক্ষতার নামে সার্কাস
  • ১৪ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: এই বেশ ভালো। এতদিন ধরে সাংবিধানিক পদের যে মুখোশটা ছিল, সেটা আর থাকল না। তেল কুমার মহাশয় একেবারে খুল্লামখুল্লা তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোপ দেগে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁর কাছে তৈলমর্দন এবং আনুগত্যই শেষ কথা। সাংবিধানিক পদটাকে একেবারে তৃতীয় শ্রেণির প্রাইভেট চাকরির স্তরে নামিয়ে আনলেন তিনি। দেখালেন, আমি ভাই চাকরি করি। আমাকে যারা মাইনে দেয়, তারা যা বলবে, আমি সেটাই করতে বাধ্য। কিন্তু তেল কুমার মহাশয় বোধহয় ভুলে গিয়েছেন, বেতনটা তাঁর কেন্দ্রীয় সরকারি কোষাগার থেকে আসে ঠিকই, কিন্তু সেই টাকার সবটাই সাধারণ মানুষের। আম ভোটারের। তাঁরা আয়ের উপর ট্যাক্স দেন, তেলের উপর, চালের উপর, পরিষেবার উপরও। তারপর মাস গেলে আপনার অ্যাকাউন্টে মোটা টাকা ঢোকে। আর সেই অন্নদাতাদেরই আপনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখেন। ভোটের ‘ট্যাক্স’ দেওয়ার জন্য। গণতন্ত্রের মাশুল গুনতে। তিনি যে ভারতেরই নাগরিক, সেটা প্রমাণ করতে। দায় সম্পূর্ণ তাঁর। নির্বাচন কমিশনের অপদার্থতায় তাঁর নামের বানান ভোটার তালিকায় বদলে গিয়েছে... তাতে কী? দায় নিতে হবে ওই লোকটাকেই। ওই মহিলাকেই। প্রমাণ করতে হবে, তিনি বৈধ ভোটার। না হলে? নাম কাটবে। সহজ উত্তর। একেই না বলে আনুগত্য? অসীম আনুগত্য। দিল্লির বড়োবাবু বা দলবদলু খোকাবাবু... এসআইআর শুরুর আগে সেই যে বলেছিলেন, এক কোটি ভোটার বাদ যাবে! সেই ‘কথা’র মান তো রাখতে হবে! রেখেছেন তেল কুমার। যখনই দেখলেন, মৃত ও স্থানান্তরিত মিলিয়ে সংখ্যাটা কিছুতেই ৬০ লক্ষ পেরচ্ছে না, ঝুলি থেকে বেরল লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি, আর তারপর অ্যাডজুডিকেশন। গোটা ভারতে এসআইআর হয়েছে। কিন্তু কোনো রাজ্যে কি লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির নামে কমিশনের এক অবৈধ সন্তান এভাবে বৈধ ভোটারদের উপর চাবুক চালিয়েছে? না, চালায়নি। কারণ, সেইসব রাজ্যে আনুগত্য প্রমাণের দরকার পড়েনি। সেইসব রাজ্যে নরেন্দ্র মোদির প্রেস্টিজ ফাইট নেই। সেইসব রাজ্যে স্রেফ ইগোর জন্য যাবতীয় কেন্দ্রীয় প্রাপ্য বন্ধ রাখতে হয় না। আর সবেচেয়ে বড়ো কথা, সেইসব রাজ্যে এমন কঠিন বিজেপি বিরোধিতাই নেই।

Advertisement

বিধানসভা ভোট? সত্যিই কি বাংলার এই সাজসজ্জা দেখে ভোট বলে আর মনে হচ্ছে? নাকি স্রেফ যুদ্ধক্ষেত্র? আড়াই লক্ষাধিক আধাসেনা... ইঙ্গিত মিলছে, আসছে আরও। একের পর এক স্কুলঘরের দখল নিয়েছে তারা। ছেলেমেয়েরা দেখছে, অবাক হচ্ছে। সিঁটিয়ে যাচ্ছে আতঙ্কে। বন্দুকধারী তারা। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের তাগিদে এসেছে। অন্তত তেমনটাই দাবি কমিশনের। বাকি রাজ্যেও কি তাই? নাকি বাকি রাজ্যে কি রাজনীতি নেই? হিংসা নেই? পার্টি আশ্রিত দুষ্কৃতী নেই? আছে। কিন্তু সেইসব রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি মাস ছয়েক আগেও গেরুয়া শিবিরের বশ্যতা স্বীকার করে নিতেন, তাহলেই এই সমরসাজ দেখতে হত না বাংলার মানুষকে। তখন এই বাংলার আইন-শৃঙ্খলা আর গণতন্ত্রের জন্য ‘থ্রেট’ বলে মনে হত না তেল কুমারের। প্রাক ভোট এবং ভোট পরবর্তী হিংসার প্রসঙ্গই আলোচনায় উঠত না। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সেটা করেননি। তাই এত ‘জাঁকজমক’। তাই প্রথমে ৫৮ লক্ষ, তারপর ৬ লক্ষ, আর তারপর ২৭ লক্ষাধিক। সব মিলিয়ে প্রায় ৯২ লক্ষ নাম বাদ বাংলার ভোটার তালিকা থেকে। একেবারে থালায় সাজিয়ে নির্লজ্জতার চাবিকাঠি তুলে দেওয়া... আসুন মশাই, এই রইল পশ্চিমবঙ্গ। এমন তেলকুমারের সংস্থাকে তো বিজেপির ফ্যানক্লাব ছাড়া আর কিছুই বলা যাচ্ছে না! রাখঢাকও তারা খুব একটা করছে বলে মনে হয় না। কারণ, ৮ এপ্রিল সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট। একইসঙ্গে অসম, পুদুচেরি, কেরল ও পশ্চিমবঙ্গের জন্য। বাকি তিন রাজ্যের জন্য গণতন্ত্রের উৎসব। আর বাংলার জন্য কমিশনের অফিশিয়াল হ্যান্ডলে লেখা হল, ‘তৃণমূলকে সোজাসুজি জানানো হচ্ছে যে, এবারের পশ্চিমবঙ্গের ভোট হবে, ভয়হীন, ছাপ্পাহীন, হিংসা রহিত, প্রলোভনহীন, বুথ ও সোর্স জ্যামিং ছাড়া।’ এরপরও কি বলতে হবে, মুখোশ বলে আর কিছু আছে? কোনো সাংবিধানিক সংস্থা কি একটি রাজ্যের শাসক দলকে টার্গেট করে সরাসরি এমন ভাষায় মন্তব্য করতে পারে? এটা গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্রের সার্কাস চলছে। সঠিক শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন আম আদমি পার্টির সঞ্জয় সিং—বিজেপির দালাল। গোটা দেশের বিরোধীরা বাংলায় এসআইআর নিয়ে একজোট হয়ে গিয়েছে। চোখে আঙুল দিয়ে নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্বের ভান্ডা ফোঁড় করছে। তারপরও ওঁরা উদাসীন। 
একটা বিষয় নিশ্চিত, তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য এবার লড়াইটা অন্যবারের মতো নয়। একশো রানের টার্গেটে কমিশন বিজেপির জন্য ৪০ রান করে রাখছে। সেটাও প্রকাশ্যে। নিন্দুকে বলছে, আলাদা একটা রাজনৈতিক দল হিসাবে নাম লেখালেই তো পারে! তাঁরা এটা বুঝছেন না, সেক্ষেত্রে তো তাদের রান আর বিজেপির স্কোরবোর্ডে উঠবে না! সংগঠন নেই। মোদি-শাহ ছাড়া সেই অর্থে প্রচার নেই। এলাকায় এলাকায় জনসমর্থন নেই। বাইরে থেকে লোক ভাড়া করে এনে এখনও কলকাতা শহরে রাজনৈতিক কর্মসূচি ভরাতে হয়। আগ্রাসী প্রচার যতটুকু আছে, তা সোশ্যাল মিডিয়ায়। তাহলে ওই ৪০ রান তো আলবাৎ প্রয়োজন! তেল কুমারও আনুগত্যের রেকর্ড গড়েই চলেছেন। নাম বাদ দেওয়ায় নয়! সে তো অন্য রাজ্যেও হয়েছে। বাংলার বিশেষত্ব হল বাছাই করে নাম বাদ দেওয়ায়। অ্যাডজুডিকেশনে। আর অবশ্যই বদলিতে। তেল কুমার মহাশয় এই গ্রাউন্ডে যে রেকর্ড গড়লেন এবং গড়ে চলেছেন, তা আগামী শতবর্ষে কেউ ভাঙতে পারবেন বলে মনে হয় না। এরপরও দলবদলু খোকাবাবু প্রকাশ্যে সিইও সাহেবকে বলতে পারেন, ‘যাঁদের বলব, বদলি করতেই হবে।’ তিনিও বশংবদের মতো শোনেন। ২৩ তারিখ পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রশাসনের কোনো আধিকারিক আর তাঁর চেয়ারে থাকবেন কি না সন্দেহ। আর ২৯ এপ্রিলের আগে হয়তো আমরা দেখব, কমিশনের বসানো অফিসারদেরও বদলি রেকর্ড স্তরে পৌঁছে গিয়েছে। আমরা ধরে নেব, এটাই ‘নিউ নর্মাল’। গেরুয়া আধিপত্যে এমনটাই হওয়া উচিত। ধর্মের বিভাজন? স্বাভাবিক। কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা আটকে থাকা? স্বাভাবিক। ভোটের নামে প্রাতিষ্ঠানিক হম্বিতম্বি? সেটাও স্বাভাবিক। তাই তো এক ঘোষবাবু বাদ যাওয়া ভোটারদের ‘দেশদ্রোহী’ বলে দেগে দেওয়ার পরও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। তখন আদর্শ আচরণবিধি ভঙ্গ হয় না। তৃণমূলের নেত্রীর নামে যাচ্ছেতাই ভাষায় কাদা ছোড়ার পরও আর এক মহিলা প্রার্থীকে খোলকরতাল বাজানেওয়ালারা তোল্লাই দেন। তখনও বিধিভঙ্গ হয় না। এরপরও এই ভোটপ্রক্রিয়াকে সুষ্ঠু, বিধিসম্মত বলা যায়? তৃণমূলের নাম করে যদি কমিশন বলে, এবার হিংসামুক্ত, অবাধ ভোট হবে... তাহলে কি এই নির্বাচনকে নিরপেক্ষ বলা যায়? এই বার্তা কি সরাসরি ভোটারদের উদ্দেশে বার্তা নয় যে, তৃণমূলকে ভোট দেবেন না। বিজেপিকে দিন! 
ভোটদান গণতান্ত্রিক অধিকার। আপনি কাকে ভোট দেবেন, সেটা অন্য কেউ ঠিক করে দিতে পারে না। কোনো ব্যক্তি না, রাজনৈতিক দল না, কমিশনও না। রাজনৈতিক দল শুধু প্রচার করতে পারে, ইস্তাহার প্রকাশ করতে পারে, দাবি করতে পারে... আমরাই আচ্ছে দিন আনব। কিন্তু কমিশন? সেটাও পারে না। তারা পারে ভোটের পরিকাঠামো এবং পরিবেশ তৈরি করতে। ভোটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। কোনো রাজনৈতিক দলকে আক্রমণ করার অধিকার তাদের নেই। এটা সাফ ভোটারকে প্রভাবিত করা। কোনো সাংবিধানিক সংস্থা যদি এমন আচরণ করে, সাধারণ ভোটার তো মনে করতেই পারে, ‘কমিশন যখন বলছে, নিশ্চয়ই ভুল নয়!’ এক্ষেত্রে আদর্শ আচরণবিধি কি ভঙ্গ হল না? 
নিরপেক্ষ বলে আদৌ কিছু হয় না। সেটা কমিশন এবার প্রমাণ করে দিয়েছে। তাই এবার দায়িত্ব সম্পূর্ণ বাংলার মানুষের। পরিবেশ, পরিস্থিতি, প্রতীক এবং প্রার্থী... এই চার সমীকরণ বিচার করে সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। ভোটের চারদিন আগে থেকে আধাসেনা বুথের দখল নেবে। ‘দুষ্কৃতী দমনে’র নামে দাপাদাপি হবে। একটু বেচাল দেখলে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশও জারি হবে। সেটাও কমিশন জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই ‘বেচাল’ কার পক্ষে এবং কার বিপক্ষে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। ধরে নেওয়াই যেতে পারে, এ-টিমের পক্ষেই বি-টিম সিদ্ধান্ত নেবে। আর গণতন্ত্রের এই আইপিএলে এ-টিমের মালিকানা কার হাতে? এর উত্তর বলতে পারার জন্য কোনো পুরস্কার নেই। অবসরের পর প্রাইজ পোস্টিং থাকলেও থাকতে পারে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ