রাজেশ ঘোষ (প্রত্যক্ষদর্শী): ত্রিবেণী সঙ্গমের দিকে তখন জনস্রোত। ভিড় ঠেলে চলাই দুষ্কর। কয়েক পা এগিয়েই আবার দীর্ঘ অপেক্ষা। আচমকা পিছন থেকে ধাক্কা। মুহূর্তের মধ্যে বিপুল ভিড় বেসামাল হয়ে গেল। ধাক্কায় সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধা কিছুটা ঝুঁকে গেলেন। ছেলে হাত ধরেছিলেন। কোনওরকমে পড়ে যাওয়া থেকে আটকালেন। কিন্তু, পরের মুহূর্তে আরও একটা ধাক্কা। আর পারলেন না বৃদ্ধা। হুমড়ি খেয়ে লুটিয়ে পড়লেন। একবার হাত বাড়িয়ে চেষ্টা করলাম। যদি টেনে তোলা যায়। কিন্তু আগল ভাঙা ভিড় আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল অন্যদিকে। চোখের সামনে দেখলাম, পড়ে রয়েছেন বৃদ্ধা... আর তাঁর উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে হাজার হাজার পা। ছেলেও মাটিতে লুটিয়ে। কাতরাচ্ছেন। কোনওরকমে একটা বাঁশের ব্যারিকেডের ধারে পৌঁছে সামাল দিলাম। সামনে তখন শুধু পিষে যাওয়ার দৃশ্য। কারও মা, কারও স্ত্রী, কারও সন্তান...। সবাই নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত। পায়ের নীচে থেঁতলে যাচ্ছে আর একটা প্রাণ, অথচ সেদিকে তাকানোর ফুরসৎ নেই। তাঁরা জানেন, একটু বেসামাল হলে তাঁদের মৃত্যু নিশ্চিত। কয়েক মিনিট... হুড়োহুড়ির দাপট স্তিমিত হল। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। কানে আসছে শুধু কান্নার রোল। হাজার হাজার মানুষের আর্তনাদে পুণ্যভূমির বাতাস এক লহমায় তখন ভারী। কেউ কেউ তো বেঁচেও আছে! কাতরাচ্ছে যন্ত্রণায়। অনেকের মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে। কারও দু’চোখ যেন ঠেলে বেরিয়ে আসছে। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের। ছেলে-মেয়েদের হাত ধরে পুণ্যস্নানে এসেছিলেন। সেই হাত হারিয়ে গিয়েছে। রাস্তায় পড়ে থাকা দেহ উল্টে কেউ কেউ খুঁজছেন কাছের মানুষকে। পাবেন কীভাবে? মুখ চেনাই তো যাচ্ছে না!
Advertisement
এই জন্যই কি মানুষ আসে পুণ্যে? ১০ কোটি মানুষ এদিন স্নান করবেন, সেটা তো প্রশাসনই বলছিল! সেই ভিড় সামলানোর এতটুকু ব্যবস্থা থাকবে না! সন্ধ্যা থেকে ভিড় বাড়ছে, অথচ কোনও সক্রিয়তাই ছিল না ওদের। ঘাটে যাওয়ার রাস্তার পাশে আখড়া। তাতে রাস্তা আরও ছোট হয়ে গিয়েছে। বিপর্যয়ের পর তৎপরতার মানে কী? বর্ধমানের নীলপুর থেকে গাড়ি ভাড়া করে গিয়েছিলাম। প্রয়াগের ৫০ কিমি আগেই দেখি, গাড়ির লম্বা লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ সরানোর নেই। কোনও ব্যবস্থা নেই। বহু কসরত করে ঘাটে পৌঁছেছিলাম। সেখানেও ছিল অব্যবস্থার ছবি। পুণ্যস্নান করতে এসে এভাবে মৃত্যুমিছিল দেখতে হবে... ভাবিনি। বারবার মনে পড়ছে সেই বৃদ্ধার কথা। সারা জীবন আক্ষেপ থাকবে... যদি কিছু করতে পারতাম!



