


বিশেষ নিবন্ধ, মৃণালকান্তি দাস: মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ডলারকে সোনার মান থেকে মুক্ত করে আমেরিকাকে এক নতুন চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। সালটা ১৯৭১। প্রশ্ন উঠেছিল, বিশ্বের অন্যান্য দেশ কেন ডলার গ্রহণ করবে? কারণ, তখন ডলার তো কেবল একটি কাগজ, যার পিছনে কোনো বাস্তব সম্পদ নেই। সেই সংকট সমাধানে আমেরিকা থাবা বসায় পশ্চিম এশিয়ায়।
১৯৭৩ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি গোপন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেখানে বলা হয়, সৌদি আরব তেল বিক্রির ক্ষেত্রে শুধু ডলার গ্রহণ করবে। এর পরিবর্তে আমেরিকা সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা ও নিরাপত্তা দেবে। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য ওপেক (অর্গানাইজেশন ফর পেট্রলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ) দেশগুলিও এই চুক্তির অনুসরণ করে। ফলে বিশ্বের সব দেশ তাদের প্রয়োজনীয় তেল কেনার জন্য ডলার সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়। যারাই তেল কিনতে চায়, তাদেরই ডলারের প্রয়োজন। ফলে, বিশ্বের সমস্ত দেশ তাদের রিজার্ভে ডলার জমাতে বাধ্য হয়। এভাবেই ডলার সোনার পরিবর্তে ‘তেলের মানদণ্ডে’ পরিণত হয়। একেই বলে ‘পেট্র-ডলার ব্যবস্থা’। যা আমেরিকাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। কারণ, তারা যত খুশি ডলার ছাপাতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলিকে তা ব্যবহার করতে বাধ্যও করতে পারে।
পেট্র-ডলার আমেরিকাকে পশ্চিম এশিয়ায় দিয়েছে অপরিসীম প্রভাব। ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউনাইটেড স্টেটস-সৌদি অ্যারাবিয়ান জয়েন্ট কমিশন অন ইকোনমিক কো-অপারেশন-এর মাধ্যমে সৌদি আরব তেল বিক্রির থেকে অর্জিত লাভের অর্থে মার্কিন পণ্য কেনা শুরু করে। মার্কিন পণ্য বলতে বিপুল অস্ত্র। ওপেকভুক্ত বেশিরভাগ দেশ সেই পথ অনুসরণ করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় পেট্র-ডলার রিসাইক্লিং। অর্থাৎ, তেল রপ্তানিকারকদের তাদের ডলারের মুনাফা আবার মার্কিন ট্রেজারি বন্ড এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে হয়। এটি রিজার্ভ কারেন্সি হিসেবে মার্কিন ডলারের ভূমিকাকে শক্তিশালী করে। আমেরিকার প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ, ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল-মিলিটারি কমপ্লেক্স’ এবং ‘অন্তহীন যুদ্ধে’ অর্থের জোগান দেয়। আর এই কারণেই পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন হেজিমনির সবচেয়ে বড়ো হাতিয়ার এই পেট্র-ডলার। বহুদিন ধরে চীন সেই ‘পেট্র-ডলার’-এ আঘাত হানতে চেয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে সেই সুযোগ করে দিয়েছেন!
চীন আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে দু’টি সমান্তরাল পথে— একজন কূটনীতিক ও একজন সামরিক মুখপাত্রের মাধ্যমে। এর অর্থ চীন এই যুদ্ধকে চরম রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক হুমকি—উভয় দিক দিয়েই দেখছে। চীনের সামরিক মুখপাত্র স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, আমেরিকার ইতিহাস মাত্র ২৫০ বছরের। অথচ, তার মধ্যে ওরা মাত্র ১৬ বছর শান্তিতে ছিল। আমেরিকা এখন বিশ্বের বিপদ! ‘যুদ্ধে আসক্ত’। আমেরিকা নৈতিকতার পথ হারিয়ে ফেলেছে। গ্লোবাল সাউথ (বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলি)-এর কাছে বেজিংয়ের এই বার্তা স্পষ্ট— আমেরিকার দাদাগিরি বন্ধ করতে হলে ‘পেট্র-ডলার’-এ আঘাত হানো। ‘প্যারাডাইম শিফট’-এ পেট্র-ডলারকে দুর্বল করো। বিকল্প হিসেবে পেট্র-ইউয়ানে তেল কেনো!
২০১৮ সালে পেট্র-ইউয়ানের জন্ম সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে। এই পেট্র-ইউয়ান ভেনেজুয়েলা, রাশিয়া, ইরান, উত্তর কোরিয়ার কাছে জনপ্রিয়। একই সঙ্গে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়াও পেট্র-ইউয়ানকে বেছে নিয়েছে। ইরাক সম্প্রতি চীনের সঙ্গে ইউয়ানে বাণিজ্য করার কথাও ঘোষণা করেছে। ইরান যুদ্ধের আবহে সেই সম্ভবনা আরও গতি পেয়েছে। আর তার প্রেক্ষাপট— হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের সংযোগকারী ১৬৭ কিলোমিটার লম্বা এবং মাত্র ৩৩-৩৯ কিলোমিটার চওড়া হরমুজ দিয়েই বিশ্বের ২০ শতাংশ খনিজ তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করে থাকে পশ্চিম এশিয়ার প্রায় সমস্ত আরব রাষ্ট্র। লড়াইয়ে জোড়া ‘সুপার পাওয়ার’কে নাকানিচোবানি খাওয়াতে খনিজ তেল এবং তরল প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণের কৌশলগত সামুদ্রিক রাস্তা সেই হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করেছে তেহরান।
ইরানের সাফ কথা, হরমুজ দিয়ে নিরাপদে ট্যাঙ্কার নিয়ে যেতে হলে, বদলাতে হবে তেলব্যবসার ধরন। তারা একবারও বলছে না হরমুজ প্রণালী সকলের জন্য অবরুদ্ধ। এটা কেবল আমেরিকা এবং তাদের অনুসারীদের জন্য অবরুদ্ধ, যারা পেট্র-ডলারে লেনদেন করে। ইরান এখন কেবল তেলবাহী সেই ট্যাঙ্কারগুলি চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে, যেগুলির পণ্যের লেনদেন পেট্র-ইউয়ানে সম্পন্ন হয়েছে। ইরানের এই কৌশল সামরিক নয়। এটা যেন আর্থিকভাবে ‘পারমাণবিক অস্ত্র’। ইরান ইতিমধ্যেই গ্লোবাল সাউথের বাকি দেশগুলির অনুসরণের জন্য একটি মডেল তুলে ধরেছে। সেই মতো তেহরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এখন আন্তসীমান্ত আন্তব্যাংক লেনদেনব্যবস্থার (সিআইপিএস) মাধ্যমে ইউয়ানে নিষ্পত্তি হচ্ছে।
১৯৭৪ সালে হওয়া ‘পেট্র-ডলারের’ চুক্তির মেয়াদ ছিল ৫০ বছর। ২০২৪ সালে সেটা শেষ হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সমঝোতাটির পুনর্নবীকরণ করেনি সৌদি প্রশাসন। কিন্তু, তার পরেও দুনিয়া জুড়ে আধিপত্য বজায় রেখেছে ডলার। এখনও বিশ্বের তেলবাণিজ্যের ৮০ শতাংশ পরিচালিত হয় মার্কিন মুদ্রায়। সামরিক বিশেষজ্ঞদের দাবি, হরমুজ অবরুদ্ধ করে সেই অর্থনীতির গোড়ায় আঘাত হানতে চেয়েছে ইরান। ফলে ওয়াশিংটনের পক্ষে তেহরানের শর্তে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া অসম্ভব। আবার হরমুজ অবরুদ্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে খনিজ তেলের দাম। ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মারাত্মক চাপে পড়েছে ওয়াশিংটন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরলের কথায়, যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকট ১৯৭৩ ও ১৯৭৯ সালের তেল সংকট এবং রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ফলে গ্যাস ঘাটতি— এই সবকিছুকে ছাড়িয়ে গিয়েছে।
তেহরানকে ঠেকাতে গিয়ে শেষপর্যন্ত ট্রাম্পকে আপস করতে হয়েছে চিরশত্রু রাশিয়ার সঙ্গে। এতদিন তেল বাণিজ্যে রাশিয়াকে একঘরে করার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছিলেন ট্রাম্প। তেল বিক্রির টাকায় রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ চালাচ্ছে, এই অদ্ভুত যুক্তিতে ভারতকে রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে বাধ্য করেন তিনি। সেই জায়গায় বেশি দামে আমেরিকার তেল কিনতে ভারতকে বাধ্য করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। রাশিয়াকে বিপাকে ফেলতে একইসঙ্গে ঢালাওভাবে রুশ তেল বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন ট্রাম্প। কিন্তু হরমুজ অবরোধের পর বিশ্ববাজারে তেলের দামে স্থিতাবস্থা আনতে আর কোনো পথ খোলা নেই ট্রাম্পের সামনে। আপাতত রাশিয়ার তেল বিক্রির ওপর থেকে নিষেধজ্ঞা তুলে নিয়েছেন তিনি। সারা বিশ্বে এখন তেল বিক্রি করতে পারবে রাশিয়া। এই ছাড় জারি থাকবে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্তাদের ধারণা এতে কয়েক লক্ষ ব্যারেল তেল বাজার আসবে এবং দাম কমবে। গোটা ইউরোপ দেখছে, যে রাশিয়াকে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য এতদিন ‘শাস্তি’ দিচ্ছিলেন ট্রাম্প, ইরান যুদ্ধের চাপ সামলাতে সেই দেশকেই এখন তেল বিক্রির অনুমতি দিতে হচ্ছে। এই সুযোগে নিজেদের কোষাগারে কোটি কোটি ডলার গুছিয়ে তুলছে রাশিয়া। কোথায় গেল রাশিয়াকে একঘরে করার দম্ভ? কোথায় গেল ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য রাশিয়াকে ধ্বংস করার হুমকি? তাহলে কি ইরান যুদ্ধ হয়ে উঠল ট্রাম্পের প্যান্ডোরার বাক্স?
এটা শুধু তেলের নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়—ইরানে এই এলোমেলো, পরিকল্পনাহীন ‘অভিযান’–এর (ট্রাম্পের ভাষায় ‘এক্সকারশন’) যে কথিত কারণ দেখানো হচ্ছে, তার চেয়েও অনেক বড়ো কিছু। যা গোটা দুনিয়াকে বদলে দিতে পারে। হরমুজ প্রণালীকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সংশোধিত ‘সান জুর রণকৌশল’। একটি সংযোগ করিডর হরমুজ প্রণালী এবং একটি মুদ্রা ইউয়ান— উভয়ই এখন সাম্রাজ্যবাদী বিনাশের মারণাস্ত্র। পারমাণবিক বোমার আর প্রয়োজনই–বা কী?
অনেকের ধারণা, ডলারের দর নিম্নমুখী হলেই দাম বাড়বে ভারতীয় মুদ্রার। কিন্তু বাস্তবে তা না-ও হতে পারে। উলটে সে ক্ষেত্রে আরও পড়তে পারে টাকার দাম। বর্তমানে ডলারের নিরিখে ৯৩-তে ঘোরাফেরা করছে রুপির মূল্য। অন্যদিকে, এক ইউয়ানের জন্য আরবিআইয়ের খরচ হচ্ছে প্রায় ১৪ টাকা। চীনা মুদ্রার সঙ্গে খনিজ তেল সম্পৃক্ত হলে রেনমিনবির দাম যে রকেট গতিতে ঊর্ধ্বমুখী হবে, তা বলাই বাহুল্য। নয়াদিল্লির জন্য যা বেশ উদ্বেগের।
আমরা এখন যা দেখছি, তা পারস্যবাসীর একধরনের দাবা খেলা। যেখানে তাঁরা খুব দক্ষ। তবে এর মধ্যে চীনের ‘ওয়েইচি’ (ইংরেজিতে ‘গো’) খেলার উপাদানও রয়েছে। ‘গো’ একটি প্রাণবন্ত খেলা। এই খেলায় ব্যবহৃত ছোটো পাথরগুলি যখন একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত হয়, তখন তারা বোর্ডজুড়ে একটি সুনির্দিষ্ট আকার তৈরি করে এবং দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ইরান রণাঙ্গন হল ভূরাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক দাবার বোর্ড। এর পুরোটা জুড়েই রয়েছে সঠিক অবস্থান গ্রহণ, ধৈর্য, তিল তিল করে সুবিধা সঞ্চয় করা এবং সুনিপুণ কৌশল পরিচালনা।
এটাই সেই ‘গোপন রহস্য’, কেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এখন চীনকে চূড়ান্ত চালটি দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। বেজিং বছরের পর বছর ধরে অসীম ধৈর্যের সঙ্গে এই দাবার বোর্ড সাজিয়েছে। একগুচ্ছ বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, ব্রিকস এবং এসসিওতে (সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন) মূল ভূমিকা পালন করা, নতুন সিল্ক রোড নির্মাণ করা, বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করা এবং তাদের কূটনীতিকে শক্তিশালী করা— এর সবই ছিল সেই বোর্ডের অংশ।
সংবাদসংস্থা দ্য ক্রেডলের কলামিস্ট পেপে এসকোবার লিখছেন, ‘গো’ খেলাটি অত্যন্ত যুক্তি মেনে খেলতে হয়। আপনি যদি বোর্ডটি ঠিকভাবে সাজাতে পারেন, তবে আপনার ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই। খেলাটি তখন নিজেই নিজের গতিতে এগোতে থাকে। আমরা এখন ঠিক সেই পর্যায়েই আছি। আর এই কারণেই সেই সাম্রাজ্যবাদী হুমকিদাতারা, তার চাটুকার, সহায়তাকারী এবং অনুগত রাষ্ট্রগুলি আজ স্তম্ভিত ও পাথর হয়ে গিয়েছে। তারা সবাই আজ নিজেদেরই ঔদ্ধত্যের চোরাবালিতে বন্দি!