


কাজলকান্তি কর্মকার, ঘাটাল: পরাধীন ভারতে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যে স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল, মেদিনীপুর তার অন্যতম পীঠস্থান। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার আনাচে-কানাচে যে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়, তার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয় চন্দ্রকোণা-২ ব্লকের বসনছড়া পঞ্চায়েতের প্রসাদপুরের ফাঁসিডাঙায়। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের গণবিদ্রোহের এক জ্বলন্ত ইতিহাস বহন করে ফাঁসিডাঙা।
তখনকার দিনে ইংরেজ নীলকররা বাংলার চাষিদের নীলচাষে বাধ্য করত। ধান, পাট বা অন্য ফসলের তুলনায় নীলচাষ কৃষকদের জন্য চরম ক্ষতিকর ছিল। আর এই নীলচাষ থেকেই ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা প্রচুর মুনাফা লুটত। তার প্রতিবাদে চন্দ্রকোণা, গড়বেতা, রামজীবনপুর সহ বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। এই ক্ষোভ থেকেই জন্ম নেয় ‘লায়েক’ বা ‘চুয়াড় বিদ্রোহ’। তাঁতি, জেলে, মাঝি, চাষি থেকে শুরু করে রাজা-মহারাজারাও এই বিদ্রোহে সামিল হয়েছিলেন।
এই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন সেনাপতি অচল সিং ও চন্দ্রকোণার দুই অকুতোভয় যোদ্ধা যুগল সর্দার ও কিশোর সর্দার। তাঁদের নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। ব্রিটিশ কর্মচারীদের উপর হামলা চলে। নীলচাষ ব্যাহত হয় ও ব্রিটিশ প্রশাসন বেসামাল হয়ে পড়ে।
বিদ্রোহ দমন করতে চার্লস রিচার্ডসন ও হেনরিকে পাঠানো হয়। অনেক কৌশলের পর তারা যুগল ও কিশোর সর্দার সহ বহু বিদ্রোহীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এরপর ১৮১২সালে ব্রিটিশরা ফাঁসিডাঙায় একটি উঁচু ঢিবির উপর ফাঁসির মঞ্চ তৈরি করে। ভবিষ্যতে যাতে এলাকার কেউ বিদ্রোহ করার সাহস না পায়, সেজন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দিতেই এই উদ্যোগ নিয়েছিল তারা। সেখানে শুধুমাত্র বিদ্রোহীদের ফাঁসিই দেওয়া হয়নি, বর্বরতার আরও অনেক নিদর্শন দেখা গিয়েছিল। ফাঁসির মঞ্চের পাশে একটি বিশাল বটগাছ ছিল। সেই গাছের নীচে আগুন জ্বালিয়ে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে অনেক বিদ্রোহীকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। আবার অনেককে হিংস্র ডালকুত্তা লেলিয়ে হত্যা করা হয়। অনেক বিদ্রোহীকে হাজার হাজার মানুষের সামনে সেই বটগাছের ডালে ফাঁসি দেওয়া হয়। সেখানেই যুগল সর্দার, কিশোর সর্দার এবং আরও বহু প্রথম সারির স্বাধীনতা সংগ্রামী হাসিমুখে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন। স্থানীয়রা জানালেন, একটা সময় এই ফাঁসিডাঙা স্থানটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। সেখানে চটুল গান আর নেশার আসর দেখা যেত। তবে এখন স্থানীয় প্রশাসন এই ঐতিহাসিক স্থানের গুরুত্ব উপলব্ধি করে এটি নতুনভাবে সাজিয়ে তুলেছে। বিডিও উৎপল পাইক বলেন, বেশ কয়েকবছর আগে ফাঁসিমঞ্চটি সংস্কার করা হয়েছে। ওই এলাকা একটি সুসজ্জিত পার্কে রূপান্তরিত করা হয়েছে। সেখানে দেওয়ালজুড়ে চিত্রাঙ্কণ, সুন্দর গাছপালা, ফোয়ারা ও কংক্রিটের রাস্তা দেখা যায়। চন্দ্রকোণা-২ পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ হীরালাল ঘোষ বলেন, নতুন সাজে সজ্জিত ফাঁসিডাঙা কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়। চন্দ্রকোণার যে সমস্ত বীর যোদ্ধা দেশের মাটির জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন, এই জায়গা তাঁদের কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়। ফাঁসিডাঙা সাজিয়ে তোলায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এখানকার গৌরবময় ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে।