রাজদীপ গোস্বামী, গড়বেতা: একদা চমকাইতলা নাম শুনলে পিলে চমকে যেত গোটা রাজ্যবাসীর। গড়বেতার সেই চমকাইতলার পড়শি গ্রামে লাল সন্ত্রাস কেড়ে নিয়েছিল তাঁর এক সন্তানকে। বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেদিন পাশে পেয়ে বলেছিলেন, ‘আমার এক হাতে তৃণমূলের পতাকা আর এক হাতে একটা বন্দুক দিতে পার? আমি এই সন্ত্রাসের শেষ দেখে ছাড়ব।’ আজ সেই হতভাগ্য মা হাসিনা মণ্ডল বয়সের ভারে খানিক ন্যুব্জ হলেও তেজি ভাব এতটুকুও কমেনি। এখন তিনি মমতার কাছে চাইছেন ঝাঁটা-জুতো। তাই নিয়ে বাংলা থেকে উৎখাত করবেন বিজেপিকে ।বৃদ্ধা মনে করেন, সিপিএমের চেয়েও ভয়ঙ্কর এই বিজেপি। সিপিএম অন্তত ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করত না। বিজেপি বাংলাকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে চায়।
সেদিন (৩১মার্চ) গড়বেতার জনসভায় দাঁড়িয়ে এই হাসিনা বিবির কথাই বলেছিলেন মমতা। বৃদ্ধাও হাজির ছিলেন সেই সভায়। বসেছিলেন এক পাশে। হাতে ধরা তৃণমূলের পতাকা। মমতা স্মৃতি খুঁজছিলেন সিপিএমের সন্ত্রাসের। মন্ত্র মুগ্ধের মতো শুনছিলেন তিনি। মমতা বলে চলেছেন, ‘এখানকার এক মা আমাকে সেই সময় বলেছিলেন, তৃণমূলের পতাকা আর বন্দুক দিতে পার? আমি বললাম, কেন মা? উত্তরে বললেন, সন্ত্রাসের জেরে আমার সন্তান হারিয়েছি। এক হাতে বন্দুক আর এক হাতে পতাকা নিয়ে আমি প্রতিশোধ নেব।’ হাসিনা বিবি তখন ভাবছিলেন একবার মঞ্চে উঠে গিয়ে চিৎকার করে বলবেন—‘আমি সেই সন্তান হারা মা!’ না, পারেননি।‘ ওখানে এতবেশি পুলিশের নিরাপত্তা। এতবেশি মানুষেরভিড়! তবে, মমতা যখন আমার প্রসঙ্গ টেনে সন্ত্রাসের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন বেশ শিহরিত হচ্ছিলাম। আমাকে আজও উনি মনে রেখেছেন।’—শনিবার সারসা গ্রামের বাড়িতে বসে বার বার ফিরে যাচ্ছিলেন ১৯৯৮ সালের সেই অভিশপ্ত দিনে।
তখন গড়বেতা লালদুর্গ। নিত্যদিন খবরের শিরোনামে উঠে আসছে চমকাইতলা, কাতরা, সারসা সহ একাধিক গ্রামের নাম। গ্রাম দখলের লড়াই চলাকালীন গুলি করা হাসিনা বিবির ছোট ছেলে হাবিলকে। গুরুতর জখম হয়ে প্রাণে বাঁচতে লুকিয়ে পড়েছিল। বৃদ্ধার অভিযোগ, ‘ছেলেটাকে ওরা খুঁজে বের করে এনে মুখে গরম জল ঢেলে খুন করেছিল।’ খবর পেয়েই মমতা চলে এসেছিলেন মণ্ডল বাড়িতে। প্রতিশোধ নিতে তখনই মমতার কাছে চেয়েছিলেন তৃণমূলের পতাকা আর বন্দুক। চোখের জল মুছে বৃদ্ধা ফের বললেন, ‘আজও ছেলেটার মুখটা ভুলতে পারিনি। সেদিনও মমতার কথা শুনে বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল।তবে, আজ আমি চাই সিপিএম নয়, বিজেপিকেই বাংলা থেকে তাড়াব। তাই মমতার কাছে ঝাঁটা-জুতো চাইছি। সিপিএমের সেদিনের নেতারা এখন বিজেপিতে। এখনকার সিপিএমের ছেলেমেয়েরা অনেক ভালো। সন্ত্রাস চায় না। ধর্ম নিয়ে ওরা রাজনীতি করে না। ওদের চেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর বিজেপি’ গড়বেতা শহর থেকে ১৯ কিলোমিটার গেলেই চমকাইতলা। সেখান থেকে কিছুটা গেলেই সারসা গ্রাম। সিমেন্টের ঢালাই করা গ্রামের প্রধান রাস্তা। কিছুটা গিয়ে ডানদিকে নেমে গিয়েছে সরু মেঠো পথ। কয়েক মিটার গেলেই হাসিনা বিবির মেজো ছেলে হারুণ মণ্ডলের ভাঙাচোরা মাটির বাড়ি। বাংলা আবাসে বাড়ি পেয়েছেন বড় ছেলে। কিন্তু, হারুণ এখনও পাননি। তাঁর কাছেই থাকেন মমতার পরম ভক্ত হাসিনা বিবি। মায়ের পাশেই বসেছিলেন হারুণ। তিনি বলছিলেন, আমরা কেউ বিজেপিকে চাই না। গ্রামে এখন শান্তি ফিরেছে। ওরা এলে সেটা আর থাকবে না। • হাসিনা মণ্ডল।