


সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: হাসপাতালের শয্যায় বিবাহ বার্ষিকীর কেক। ফুলের স্তবক। কোমায় আচ্ছন্ন স্বামীর হাত থেকে নিজের সিঁথিতে সিন্দুর ঘষছেন লাল শাড়িতে সুসজ্জিতা এক বধূ। তিনি আসানসোলের গৃহবধূ সোমা শীল চট্টোপাধ্যায়। পাঁচ মাস আগে মর্মান্তিক পথ দুর্ঘটনায় স্বামী কোমায় চলে যান। চিকিৎসকরাও হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু হার মানেননি স্ত্রী। চিকিৎসকের পরামর্শ ছিল স্বামী সার্বত্রিক চট্টোপাধ্যায় যা দেখে খুশি হতেন তাঁর সামনে সেটা তুলে ধরতে হবে। তাতে যদি ফেরে সার্বত্রিকের অনুভূতি। বুকে পাথর চেপে পাঁচ মাস ধরে সেই কাজই করে চলেছেন সোমাদেবী। প্রতিদিন সুসজ্জিত হয়ে হাসিমুখে স্বামীর সামনে এসে দাঁড়ান। স্বামীর পছন্দের পারফিউম মেখে আসেন। তাঁদের এক বছরের পুত্রসন্তান রয়েছে। যা সার্বত্রিকের প্রাণভোমরা। প্রতিদিন হাসপাতালে স্বামীর কেবিনে এসে পুত্রকে ভিডিও কল করেন বধূ। তাঁর ‘সেন্স’ ফেরাতেই হাসপাতালের কেবিনে হয়েছিল বিবাহবার্ষিকীর আয়োজন। বহু মাস পর যা দেখে স্বামীর চোখ দিয়ে জল গড়িয়েছে। তাই এই অশ্রু সোমার জয়ের প্রথম পদক্ষেপ। আজ, বিশ্ব নারী দিবসে এক স্ত্রীর স্বামীকে ফিরে পাওয়ার লড়াইকে নেটিজেনরাও কুর্নিশ করছেন। সোমা শীল চট্টোপাধ্যায় বলেন, বহু মানুষের কটাক্ষ শুনতে হচ্ছে। তাতে কিছু এসে যায় না। নিজের স্বামীকে বাঁচাতে আমি সব কিছু করতে পারি। আমি আমার ‘বাবান’কে ফিরিয়ে আনবই।
মনে পড়ে বলিউডের কালজয়ী সেই ছবি ‘থ্রি ইডিয়েট’। সিনেমার মূল চরিত্র র্যাঞ্চো নিজের বন্ধুর জন্য এই কাজটাই করেছিলেন। কোমায় চলে যাওয়া রাজু রাস্তোগিকে সুস্থ করতে কখনও তাঁর মাকে নতুন শাড়ি পরে ছেলের শয্যার সামনে হাজির করিয়েছিলেন র্যাঞ্চো। রিল লাইফের সেই কঠিন লড়াইটাই যে পাঁচ মাস ধরে লড়ে চলেছেন সোমাদেবী।
গত বছর ১২ অক্টোবর কলকাতার ভিআইপি রোডে হলদিরাম মোড়ের কাছে মর্মান্তিক পথ দুর্ঘটনা ঘটে। সেখানেই পেশায় বেসরকারি ব্যাঙ্কের সহকারি ম্যানেজার সার্বত্রিক চট্টোপাধ্যায় ওরফে আকাশের মাথায় গুরুতর চোট লাগে। রক্ত জমে যাওয়ায় মস্তিষ্কের কিছু অংশ বাদ দিতে হয়। চিকিৎসকরাও আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। ঠিক সেই সময় থেকেই লড়াই শুরু সোমাদেবীর।
আকাশ আসানসোলের হটন রোড এলাকার বাসিন্দা। বাবা দীপক চট্টোপাধ্যায় কোলিয়ারিতে কাজ করতেন। বাবা, মায়ের একমাত্র সন্তান আকাশের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন সোমা। শ্রীরামপুর কলেজ ফেস্টে আকাশের অনুষ্ঠান দেখে তরুণী সোমা প্রেমে পড়েন তাঁর। ১০ বছরের প্রেমের পর ২০২১ সালে বিয়ে। বর্তমানে তাঁদের এক বছরের পুত্রসন্তান জিবাংন্স রয়েছে। বহু সুখস্মৃতি নিয়ে ‘হ্যাপি ফ্যামিলি’ ছিল সার্বত্রিকের। কিন্তু গত বছরের ১২ অক্টোবর থেকে সব হিসাবে পালটে যায়। চিকিৎসকরা সোমাদেবীকে জানিয়ে দেন তাঁর স্বামীকে মীরাকেলই ফেরাতে পারে। আমরা চেষ্টা করব, আপনিও চেষ্টা করুন। অক্টোবর মাস থেকেই একাজ করে চলেছেন সোমাদেবী। সন্তানকে বাড়ি রেখে প্রতিদিন সেজেগুজে হাসপাতালে আসতে হয় তাঁকে। তারপর কোমায় আক্রান্ত স্বামীর সঙ্গে এক তরফাই গল্প করে যান। কখনও কপালে দেন প্রেমের চুম্বন তো কখনও হাত ধরে বলেন, ছেলে তো বাবাকে দেখবে বলছে। দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। প্রতিদিন নিজের চোখের জল লুকিয়ে কাজল লিপস্টিক পরে স্বামীকে খুশি করার এক কঠিন কাজ করে চলেছেন এই বধূ। কলকাতার বড় বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। খরচাও অনেক।
অন্যদিকে সোমাদেবী গৃহবধূ। তাই আর্থিক চাপও বাড়তে শুরু করেছে। নিজের এই জীবনযুদ্ধ সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে ধরছেন তিনি। সাম্প্রতিক তাঁর হাসপাতালে বিবাহবার্ষিকীর দৃশ্য নেটিজেনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নারী দিবসে সোমার এই জীবন যুদ্ধকে অনেকেই কুর্নিশ জানিয়েছেন।