


সুকমল দালাল, বোলপুর: একদা ‘সন্ত্রাসদীর্ণ’ বলে পরিচয় ছিল বীরভূমের নানুরের। গোলা-বারুদের গন্ধে ভারী থাকত বাতাস। গুলির আওয়াজে ঘুম ভাঙত গ্রামবাসীদের। বৈষ্ণব চারণকবি চণ্ডীদাসের প্রেম-পদাবলীর পীঠস্থানে নিত্য লাগত রক্তের দাগ। সেই নানুর আজ বার্তা দেয়, শান্তি আর উন্নয়নের। সন্ত্রাস এখন অতীত।
সময়টা ২০০০ সালের ২৭ জুলাই। রাজ্যে ভরা বামশাসন তখন। দীর্ঘ রাজনৈতিক রেষারেষির নির্মম ও নৃশংস বহিঃপ্রকাশ ঘটে সেদিন। সূচপুরে পিটিয়ে, কুপিয়ে হত্যা করা হয় ১১ জন ভূমিহীন খেতমজুরকে। অশান্তি, হিংসা থেমে থাকেনি এমন একটা কালো অধ্যায় তৈরি হয়ে যাওয়ার পরও। ২০০৫ থেকে ২০১০। আরও ১৪ জন গ্রামবাসী প্রাণ হারান রাজনৈতিক হিংসায়। ফলত, কোনো নির্বাচন এলেই সন্ত্রাসকবলিত নানুরের গায়ে কমিশন সাঁটিয়ে দিত ‘স্পর্শকাতর’ কথাটা। রাজ্যে পালাবদলের পর একটু একটু করে বদলাতে শুরু করে চণ্ডীদাসের জন্মভূমি। গত লোকসভা, বিধানসভা ও পঞ্চায়েত ভোটে হিংসার কোনো নজির নেই। গ্রামবাসীরা পেয়েছেন উন্নয়নের আস্বাদ। পেয়েছেন সামাজিক সুরক্ষার ভরসা। এখন আর বোমা হাতে ঘুরে বেড়ানোর সময় নেই কারও। পিস্তল ধরা হাত এখন খুঁজে বেড়ায় রুজিরুটির রসদ। আসলে, হিংসা-অশান্তি যে পেটের পরিপন্থী সেটা কিছুটা দেরিতে হলেও বুঝেছেন নানুরবাসী। বুঝিয়ে দিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার।
চণ্ডীদাসের ঢিপি বা বাশুলি মন্দির সংলগ্ন দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল বেশ কয়েকজন গ্রামবাসীর সঙ্গে। তাঁরা একবাক্যে স্বীকার করে নিচ্ছেন, একসময় রাজনৈতিক মারামারি, খুনোখুনি নানুরকে নানাভাবে বিপর্যস্ত করেছে। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার নষ্ট হয়েছে। বহু মানুষের রুজি-রুটির উপর আঘাত এসেছে। এখন উন্নয়নের সৌজন্যে সবকিছু স্থিতিশীল। তাঁদের মধ্যে একজন প্রৌঢ় বলেই ফেললেন, ‘রক্তাক্ত সেই দিনগুলি যেন আর ফিরে না আসে।’
রক্তঝরা অতীত ভুলতেই নানুরবাসী আঁকড়ে ধরেছে বর্তমানকে। ভরসা রাখছেন মমতার উন্নয়নে। এবার ভোটেও সেটাই অ্যাডভান্টেজ তৃণমূল প্রার্থী বিধানচন্দ্র মাঝির। প্রচারে তিনি তুলে ধরছেন—স্কুলে স্কুলে বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা, নতুন ক্লাসরুম নির্মাণ, মিড-ডে মিলের ঘর নির্মাণ হয়েছে। পথশ্রী প্রকল্পে খারাপ রাস্তা সংস্কার হয়েছে। নর্দমা পরিষ্কার ও নতুন করে তৈরি হয়েছে বহু এলাকায়। গ্রামেগঞ্জে বসেছে পানীয় জলের ট্যাঙ্ক ও পাম্প। আধুনিক হয়েছে বাসস্ট্যান্ড। বসেছে হাইমাস্ট লাইট। বাংলার বাড়ি প্রকল্প সহ একাধিক সমাজিক সুরক্ষাপ্রকল্পও পাচ্ছেন নানুরবাসী। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উন্নয়ন, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলির পরিকাঠামো বৃদ্ধিও নজরে পড়ার মতো।
নানুরের বাসিন্দা তথা জেলা পরিষদের সভাধিপতি কাজল শেখ বলেছেন, ‘সত্যিই নানুরের মানুষ আজ আর সন্ত্রাসের দিনগুলিতে ফিরতে চান না।’ কাজল এবার হাসন বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী। নানুরের উপরও তাঁর নজর রয়েছে। নিজের এলাকায় তৃণমূলের সংগঠন গড়েছেন নিজের মতো করেই। ফলও মিলছে হাতেনাতে। গত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী বিধানচন্দ্র পেয়েছিলেন ৬ হাজার ৬৭০টি ভোট। লোকসভা ভোটে সেই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭৬ হাজার। এই পরিসংখ্যানে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে বিধানচন্দ্রের। তৃণমূলের ব্লক সভাপতি সুব্রত ভট্টাচার্যের গলাতেও প্রত্যয়ের সুর‘আমরা আরও বড় ব্যবধানে জিতব। উন্নয়ন আমাদের ভরসা।’
তবে, বিজেপি প্রার্থী খোকন দাসও প্রচারে খানিক টক্কর দিচ্ছেন। কিন্তু, উন্নয়ন-পথে থমকে দাঁড়াতে হচ্ছে তাঁকে। তার উপর খোকনবাবুকে সামলাতে হচ্ছে দলের ভিতর অসন্তোষ ও মতবিরোধের মতো সমস্যাকে। অন্যদিকে, অশান্তি ও সন্ত্রাসের ছায়ার সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে সিপিএমকে। সূচপুর এখনও তাদের সূচের মতো বিঁধে। সেটা এবার কতখানি মেরামত করতে পারবেন প্রার্থী শ্যামলী প্রধান, সেই দিকে থেকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।