Bartaman Logo
১৮ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

বন্দিদের চিত্ত শুদ্ধিতে কবিগুরুর মানবপ্রেম, ‘কাবুলিওয়ালা’ মঞ্চস্থ করবে দাগী অপরাধীরা

বন্দিদের চিত্ত শুদ্ধিতে কবিগুরুর মানবপ্রেম, ‘কাবুলিওয়ালা’ মঞ্চস্থ করবে দাগী অপরাধীরা
  • ২৩ জানুয়ারি, ২০২৫ ০০:০০
Prefer us on Google
সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: আধ্যাত্মচেতনা থেকে রোমান্টিকতা। প্রকৃতিপ্রেম থেকে শুরু করে  মানব প্রেম কিংবা বিশ্বপ্রেম—বৈচিত্র্যে ভরা তাঁর সৃষ্টির সাগর। সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানব প্রেমের ভাবদর্শনকে হাতিয়ার করে জেলবন্দিদের সংশোধনের উদ্যোগ নিল আসানসোল সংশোধনাগার কর্তৃপক্ষ। বিশ্বকবির অমর সৃষ্টি ‘কাবুলিওয়ালা’ এবার মঞ্চস্থ করবে দাগি অপরাধীরা। আফগানবাসী ফল বিক্রেতা রহমত শেখের ভূমিকায় দেখা যাবে হাড়হিম করা একটি গণহত্যা কাণ্ডের মূল অভিযুক্তকে। আর মিনির চরিত্রে? সহপাঠীকে খুন করেছিল এক নাবালক। সে এখন সাবালক। ছোট্ট মিনির ফুলের মতো মনের ভূমিকায় দেখা যাবে তাকে। তবে মঞ্চে মিনি নয়,  ‘মনা’ নামচরিত্রে অভিনয় করবে সে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন রবি ঠাকুরের কালজয়ী ‘কাবুলিওয়াল’য় সৃষ্ট চরিত্রের বদল? জেল কর্তৃপক্ষের যুক্তি, সংশোধনাগারে হাতেগোনা যে কয়েকজন মহিলা বন্দি রয়েছে, তারা কেউই ‘মিনি’র চরিত্রে অভিনয় করার উপযুক্ত নয়। তাই, একরকম বাধ্য হয়েই চিত্রনাট্যে খানিক অদলবদল করা হয়েছে। এ ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না। বন্দিদের সমাজের মূল স্রোতে ফেরাতে রহমান-মিনির ভালোবাসার এক অনন্য রসায়নকে হাতছাড়া করতে চায়নি জেল কর্তৃপক্ষ। 
Advertisement
আগামী ২৬ জানুয়ারি, সাধারণতন্ত্র দিবসে আসানসোল সংশোধনাগার ক্যাম্পাসের মধ্যেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে কর্তৃপক্ষ। সেখানেই গান, আবৃত্তি, নাচের পাশাপাশি মঞ্চস্থ হবে ‘কাবুলিওয়ালা’। দর্শকাসনে বসে বন্দিদের সাংস্কৃতিক প্রতিভা দেখবেন পশ্চিম বর্ধমানের জেলাশাসক।  আসানসোল বিশেষ সংশোধনাগারের সুপারিনটেন্ডেন্ট চান্দ্রেয়ী হাইত বলেন, ‘এবারই প্রথম আমাদের সংশোধনাগারে নাটক পরিবেশিত হতে চলছে। বন্দিদের মধ্যে এনিয়ে উৎসাহ চোখে পড়ার মতো।’ কিন্তু ‘কাবুলিওয়ালা’ কেন? সংশোধনাগারের এক আধিকারিকের কথায়, বন্দিদের মধ্যে কবিগুরুর মানবপ্রেমের বার্তা ছড়িয়ে দিতেই তাঁর এই যুগজয়ী নাটককে বেছে নেওয়া। 
রহমত শেখের বাড়ি সুদূর আফগানে। পেটের টানে তিনি কলকাতা শহরে চলে আসেন। ঘুরে ঘুরে ফল বিক্রি করেন। সেই সূত্রে তাঁর সঙ্গে আলাপ ছোট্ট মিনির। সেই মিনির মধ্যেই কাবুলের বাড়িতে ফেলে আসা ছোট্ট মেয়ের কথা মনে পড়ে। কন্যাসন্তানকে দীর্ঘদিন ছেড়ে থাকার জ্বালা-যন্ত্রণা রহমত ভুলতে থাকেন মিনির সান্নিধ্যে। রক্তের সম্পর্ক ছাড়াও দু’জনের মধ্যে পিতা-পুত্রীর মতো হৃদয়ের বন্ধন তৈরি হয়। কিন্তু মিনির মা এই সম্পর্ক মানতে পারেননি। এভাবে চলতে চলতে নাটকের অন্য মোড় নেয় একসময়। ব্যবসার কাজ কিছুদিন বন্ধ রেখে রহমত ঠিক করেন, দেশে ফিরবেন। মিনির মতো তার মেয়েও ঠিক অতটাই বড় হয়েছে। ভেবে মনটা আকুল হয়ে ওঠে রহমতের। কিন্তু, বাজারে অনেক টাকাকড়ি বাকি পড়ে রয়েছে। কিছু টাকা অন্তত উদ্ধার করতেই হবে। এক ব্যক্তির কাছে টাকা চাইতে গিয়ে বিপত্তি। রহমতকে তিনি অসম্মানজনক কথা বলার জেরে মারামারি। রহমতের ছুরির আঘাতে জখম হন তিনি। নাটকের মোড় ঘুরে যায় একেবারে অন্যদিকে। জেলে যেতে হয় রহমতকে। অপরাধ কবুল করে নেন তিনি। দশ বছরের জেল হয় তাঁর। জেল থেকে বেরিয়েই রহমত প্রথম ছোটে মিনির বাড়িতে। গিয়ে দেখেন ছোট্ট মিনি এখন অনেক বড়। তার বিয়ের প্রস্তুতি চলছে। রহমত সামনে গিয়ে দাঁড়াতে মিনি তাঁকে চিনতে পারছে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। বড্ড আঘাত পান তিনি। ভাবতে থাকেন কাবুলে তাঁর মেয়েও ঠিক এভাবেই যদি চিনতে না পারে! শেষে মিনির বাবা বিয়ের খরচ থেকে কিছু টাকা রহমতের হাতে তুলে তাঁর বাড়ি যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। সঙ্গে দেন মেয়ের জন্য কিছু উপহার। 
আসানসোল জেল কর্তৃপক্ষ চিত্রনাট্য বদল করতে গিয়ে মিনির মায়ের জায়গায় মনার ‘কাকা’কে হাজির করিয়েছে। আর শেষ দৃশ্যে মিনির বিয়ের জায়গায় মনার চাকরি পেয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখানো হয়েছে। এই টুকু পরিবর্তন একেবারেই অনিচ্ছাকৃতভাবে করতে হয়েছে শুধুমাত্র মহিলা বন্দি না পাওয়ার কারণে। আসলে, বন্দিদের হৃদয় বদলাতে রবি ঠাকুরের মানবপ্রেম ছাড়া মোক্ষম অস্ত্র আর কি-ই বা থাকতে পারে!  
Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ