


অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: নদীয়া জেলায় নাগরিকত্বের জন্য আবেদনকারীর সংখ্যা ৮৩ হাজার ছুঁয়েছে। যার মধ্যে ৫০ শতাংশ অর্থাৎ ৪০ হাজার আবেদনকারীর শুনানি প্রক্রিয়াও শেষ হয়েছে। কিন্তু, দেখা যাচ্ছে গত আট মাসে মাত্র ৭ হাজার আবেদনকারী নাগরিকত্বের শংসাপত্র পেয়েছেন। অর্থাৎ মোট আবেদনকারীর মাত্র ৮ শতাংশ। এমনটাই ডাক বিভাগ সূত্রে জানা গিয়েছে। ছাব্বিশের নির্বাচনের প্রাক্কালে নাগরিকত্ব প্রদানে বিজেপি জুমলা ফাঁস হয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কারণ, নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করলেই ভোটার তালিকায় নাম ওঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। সেই প্রতিশ্রুতির ফানুস চুপসে গিয়েছে। তৃণমূলের দাবি, বিজেপি মানুষকে ভুল বুঝিয়ে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করিয়ে বেনাগরিক করার চক্রান্ত করছে।
রানাঘাটের জনসভা থেকে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দোপাধ্যায় সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছেন এই বলে, ‘আপনাদের নাগরিকত্বের আইনি কার্ড রাজ্য সরকার তৈরি করে আপনাদের হাতে দেবে। নরেন্দ্র মোদী, শাহকে স্বাধীনতার ৭৯ বছর পরে বাঙালিকে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে না।’
এসআইআর পর্ব শুরুর সময় ভোটারদের নাম যাতে ভোটার তালিকায় ওঠে তার জন্য সিএএ শিবির করেছিল গেরুয়া শিবির। ঘটা করে বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে ভোটারদের সিএএ’র জন্য আবেদন করিয়েছিল। এমনকী হলফনামায় নিজেদের বাংলাদেশি দাবি করতে হচ্ছিল সিএএ’তে আবেদনকারীদের। জমা দিতে হচ্ছে বাংলাদেশের পুরনো নথিও। রাজনৈতিক মহলের দাবি, মতুয়াদের নিঃশর্ত নাগরিকত্ব প্রদানের প্রতিশ্রুতি বিজেপি রাখেনি। শর্ত সাপেক্ষেই দেওয়া হচ্ছে নাগরিকত্ব। যা নিয়েও ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে মতুয়াদের মধ্যে। এই পরিস্থিতিতে বিজেপির তরফে দাবি করা হয়েছিল, নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করলেই ভোটার তালিকায় নাম থাকবে ভোটারদের।
সীমান্তবর্তী নদীয়া জেলায় উদ্বাস্তু সমস্যা স্বাধীনতার সময় থেকেই। ধুবুলিয়া রানাঘাট সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বহু মানুষ বাংলাদেশের ঢাকা, যশোর, কুষ্টিয়া থেকে নদীয়া জেলায় এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই নদীয়া জেলাতে বহু মানুষের নথি সমস্যা রয়েছে। এসআইআরের শুনানির লাইনে দাঁড়িয়ে কমিশন নির্ধারিত নথি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল বহু মানুষকে।
শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত ভোটার তালিকা বেরনোর পর দেখা যায়, নদীয়া জেলায় ২ লক্ষ ৬৭ হাজার ভোটারকে বিচারাধীন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তখনও বিজেপি নেতাকর্মীদের মুখে শোনা গিয়েছিল, যারা নাগরিকত্বের আবেদন করেছে তাদের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত থাকবে। তারপর সাপ্লিমেন্টারি তালিকা বেরোনোর পর দেখা যায়, ভোটারদের মধ্যে ২ লক্ষ ৮ হাজার ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। যার মধ্যে ১ লক্ষ ১৮ হাজার ভোটার রয়েছে নদীয়া দক্ষিণের মতুয়া অধ্যুষিত বিধানসভাগুলিতে। নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করেও ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে সরেন পাল, জগেন আধিকারীদের।
পরিসংখ্যান বলছে, নদীয়া জেলার নাগরিকত্বের আবেদনকারীর সংখ্যা গত কয়েক মাসে লাফিয়ে বেড়েছে। রাজনৈতিক মহলের দাবি, আবেদনের সংখ্যা বৃদ্ধির পিছনে অন্যতম কারণ হল এসআইআরের জেরে ফের ছিন্নমূল হওয়ার আতঙ্ক। মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়েই ডাক বিভাগ সূত্রে জানা গিয়েছিল, নদীয়া জেলার আবেদনের সংখ্যা ৪০ হাজারের কাছাকছি। তখনও পর্যন্ত দেড় হাজার মানুষ সিএএ সার্টিফিকেট পেয়েছিলেন। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সেই সময়েই বিচারাধীন ভোটারদের মধ্যে কাদের নাম থাকল, আর কাদের বাদ গেল, তা একে একে প্রকাশিত হচ্ছিল।